অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক ডাকলেন ট্রাম্প
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর অধিকারী হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে। তবুও সাম্প্রতিক সামরিক পরিস্থিতি ও চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে অস্ত্রের মজুত ও উৎপাদন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ডেকেছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, এই বৈঠকে অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সামরিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে ইঙ্গিত মিলছে যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংঘাতে অংশ নেওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী ঐতিহ্যগতভাবে অত্যন্ত নির্ভুল ও উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। তবে এসব অস্ত্র সাধারণত ব্যয়বহুল এবং তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যায় উৎপাদিত হয়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় দীর্ঘপাল্লার টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, যা অত্যন্ত কার্যকর হলেও এর খরচ অনেক বেশি।
অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক ডাকলেন ট্রাম্প….
বর্তমানে মার্কিন বাহিনী তুলনামূলকভাবে কম খরচের অস্ত্র ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। যেমন জেডিএএম (JDAM) বোমা, যেগুলো সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর ওপর নিক্ষেপ করা যায় এবং তুলনামূলকভাবে সস্তা। এতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর সঙ্গে যুক্ত অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন মেরিন কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, যুদ্ধের শুরুতে দূরপাল্লার উচ্চমূল্যের অস্ত্র ব্যবহার করা হলেও পরবর্তীতে অপেক্ষাকৃত সস্তা ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা ব্যবহার করেই অভিযান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। তার ভাষায়, এই কৌশল অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসে, ফলে সংঘাতের তীব্রতাও কমতে শুরু করে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ
তবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কিছু উদ্বেগ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ক্যানসিয়ানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হাজার হাজার জেডিএএম বোমা থাকলেও অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরবরাহ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
বিশেষ করে ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে চাপ বেশি। শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, তাদের মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশ এবং ইউক্রেনও এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি।
ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বছরে প্রায় ৭০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে। যদি ইরান এখনও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা ধরে রাখে, তাহলে এই সীমিত উৎপাদনের কারণে প্যাট্রিয়টের মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে।
ক্যানসিয়ানের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রায় ১,৬০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এই সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি দীর্ঘ সময় ধরে আকাশ থেকে ভূমিতে হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে বিমান প্রতিরক্ষা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
তার মতে, যদি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আরও কমে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে মোকাবিলা করতে সক্ষম হলেও ভবিষ্যতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কোনো নতুন সংঘাত দেখা দিলে তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এদিকে অস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ আশ্বস্ত করে বলেছেন, “ইরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার শেষ করে দিতে পারবে না।”
এই পরিস্থিতিতেই অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো ও সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই সামরিক সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
