Wednesday, February 25, 2026
Latest:
Uncategorized

কাজের প্রলোভনে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধের নরকে বাংলাদেশিরা

ভালো কাজ আর নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় পা রেখেছিলেন লক্ষ্মীপুরের মাকসুদুর রহমান। বলা হয়েছিল, সামরিক ক্যাম্পে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ—মাসে এক থেকে দেড় হাজার ডলার বেতন, সঙ্গে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ না যেতেই সেই স্বপ্ন ভেঙে পড়ে। নিজেকে আবিষ্কার করেন ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে, অস্ত্র আর ড্রোনের ছায়ায়।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ এই প্রতারণার চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসামরিক কাজের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের রাশিয়ায় আনা হচ্ছে। পরে জোরপূর্বক তাদের রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করে পাঠানো হচ্ছে ইউক্রেনের রণাঙ্গনে। যারা অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, তাদের মারধর, কারাদণ্ড এমনকি মৃত্যুর হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।

কাজের প্রলোভনে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধের নরকে বাংলাদেশিরা…..

রাশিয়ার সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে বাঁচতে সক্ষম এমন তিন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলেছে এপি। তাদের একজন মাকসুদুর রহমান। তিনি জানান, মস্কোতে পৌঁছানোর পর তাকে ও আরও কয়েকজন বাংলাদেশিকে রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজে সই করতে বলা হয়। তখন তারা জানতেন না—সেগুলো আসলে সামরিক নিয়োগের চুক্তি। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি সেনা ক্যাম্পে, যেখানে ড্রোন যুদ্ধ, আহতদের উদ্ধার এবং ভারী অস্ত্র ব্যবহারের মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

এই তিনজন জানান, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্মুখসারির বিপজ্জনক কাজে পাঠানো হয়। রুশ বাহিনী এগোনোর আগে তাদেরই সামনে যেতে হতো। কাজের মধ্যে ছিল রসদ বহন, আহত সেনাদের সরিয়ে আনা এবং নিহতদের মরদেহ উদ্ধার। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন নিখোঁজ তিন বাংলাদেশির পরিবারও।

এ বিষয়ে এপির পাঠানো প্রশ্নের জবাবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা বাংলাদেশের সরকার—কোনো পক্ষই সাড়া দেয়নি।

তবে শ্রমিকদের বক্তব্যের পক্ষে শক্ত প্রমাণ মিলেছে। এপির হাতে এসেছে তাদের ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র, রুশ সামরিক চুক্তি, মেডিকেল ও পুলিশি প্রতিবেদন এবং ছবি। এসব নথিতে দেখা যায়, বাংলাদেশি শ্রমিকদের দেওয়া ভিসা, যুদ্ধে পাওয়া তাদের আঘাত এবং সরাসরি যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ।

ঠিক কতজন বাংলাদেশি এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে যাঁরা কথা বলেছেন, তারা জানান—ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর সঙ্গে শত শত বাংলাদেশিকে তারা দেখেছেন।

মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশই নয়—রাশিয়া আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকেও, বিশেষ করে ভারত ও নেপালের পুরুষদের লক্ষ্য করে এ ধরনের নিয়োগ চালাচ্ছে।

২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় চুক্তিভিত্তিক কাজ শেষ করে দেশে ফেরেন মাকসুদুর রহমান। নতুন কাজের সন্ধানে থাকা অবস্থায় এক দালালের মাধ্যমে রাশিয়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির প্রস্তাব পান তিনি। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছে বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার শিকার হন মুন্সীগঞ্জের মোহন মিয়াজী। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের একটি গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতে গিয়ে ভয়াবহ শীত ও কঠোর পরিবেশে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। পরে অনলাইনে কাজ খুঁজতে গিয়ে এক রুশ সেনা নিয়োগকারীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাকে অধিকৃত ইউক্রেনীয় শহর আভদিভকায় একটি সামরিক ক্যাম্পে নেওয়া হয়। নিজের কাগজপত্র দেখিয়ে তিনি জানান, তাকে ‘ইলেকট্রিক্যাল কাজের’ জন্য পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় নির্যাতন।

গ্রামে ফিরে এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহন মিয়াজী বলেন, “আমাকে বেলচা দিয়ে মারা হয়েছে, হাতকড়া পরিয়ে বেসমেন্টের একটি সেলে আটকে রাখা হয়। ভয় দেখানো হয়—আদেশ না মানলে আর বাঁচতে পারব না।”

ভালো জীবনের আশায় পাড়ি জমানো এই মানুষগুলো আজ বেঁচে ফিরলেও, তাদের শরীর আর মনে রয়ে গেছে যুদ্ধের গভীর ক্ষত—যার দায় এখনো কেউ নেয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *