Uncategorized

ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে তারেক রহমান

জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রচারণার শেষ দিনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক সড়কে বিএনপির জনসমাবেশে হাজির হন দলটির চেয়ারপারসন তারেক রহমান। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে আসা এই নেতা এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের একেবারে শেষ ধাপে রয়েছেন—এমনটাই জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ফেরার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমানের। জনমত জরিপের পূর্বাভাস সত্যি হলে এটি হবে তার রাজনৈতিক জীবনের এক বিস্ময়কর প্রত্যাবর্তন। তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মতো তিনিও দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার পথে এগোচ্ছেন।

গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন বিএনপির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পরিপ্রেক্ষিতেই গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ঢাকায় ফিরে তিনি পান বীরোচিত সংবর্ধনা। বর্তমানে শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন।

ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে তারেক রহমান….

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া—এই দুই নেত্রীর দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা একসময় রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তারেক রহমান জানিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুনভাবে সাজাতে চান—যাতে বিনিয়োগ বাড়ে, কিন্তু কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না হয়। এটি শেখ হাসিনার শাসনামলের নীতির বিপরীত, যাকে ভারতঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হতো।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে তিনি দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর কথা বলেছেন। পাশাপাশি তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খেলনা, চামড়াজাত পণ্যসহ বহুমুখী শিল্প খাতে জোর দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান। স্বৈরাচারী প্রবণতা রোধে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাবও দিয়েছেন।

কার্ডিওলজিস্ট স্ত্রী ও ব্যারিস্টার কন্যা জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে দেশে ফেরার পর এত দ্রুত ঘটনাপ্রবাহ ঘটেছে যে, সময় কীভাবে কেটে গেছে তা নিজেও বুঝতে পারেননি বলে জানান তিনি। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কন্যাকে পাশে বসিয়ে তারেক রহমান বলেন,
“দেশে ফেরার পর প্রতিটি মিনিট কীভাবে কেটেছে, আমি নিজেও জানি না।”

১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় জন্ম নেওয়া তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ করেননি। পরবর্তীতে তিনি বস্ত্র ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন।

দেশে ফেরার পর নিজেকে একজন সংযত ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন তারেক রহমান। তিনি শেখ হাসিনার শাসনামলে নিজের ও পরিবারের ওপর হওয়া নিপীড়নের প্রসঙ্গ টেনে প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে সরে আসার বার্তা দিচ্ছেন।

তার ভাষায়,
“প্রতিশোধে কী আসে? প্রতিশোধ মানুষকে দেশছাড়া করে। এতে ভালো কিছু হয় না। এই মুহূর্তে আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।”

শেখ হাসিনার শাসনামলে একাধিক মামলায় তারেক রহমানকে অনুপস্থিতিতেই দণ্ডিত করা হয়। তিনি বরাবরই এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সব মামলায় তিনি খালাস পান।

লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন—কীভাবে একের পর এক নির্বাচনে বিএনপি কোণঠাসা হয়েছে, শীর্ষ নেতারা কারাবন্দি হয়েছেন, কর্মীরা নিখোঁজ হয়েছেন এবং দলীয় কার্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে।

দেশে ফিরে এখন তিনি উসকানিমূলক বক্তব্য এড়িয়ে সংযত ভাষায় কথা বলছেন। ‘রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা’ ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কথা বলছেন তিনি—যা নতুন সূচনার আশায় থাকা বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।

দলীয় সূত্রগুলোর মতে, বর্তমানে বিএনপির ভেতরে তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণ দৃঢ়। প্রার্থী নির্বাচন, রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ এবং জোট আলোচনার সবকিছুই তিনি সরাসরি তদারকি করছেন—যা একসময় তিনি বিদেশ থেকেই করতেন।

তারেক রহমানের ভাষায়,
“গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও তা টিকিয়ে রাখাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমেই আমরা সমৃদ্ধ হতে পারি, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে পারি এবং দেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *