পাল্টাপাল্টির জটে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক, কূটনৈতিক বার্তা পৌঁছায়নি জনপর্যায়ে
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই টানাপোড়েন শুরু হয় ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে। একসময় যে সম্পর্ককে ‘সোনালি অধ্যায়’ বলা হতো, তা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বরং সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই আটকে পড়েছে পাল্টাপাল্টি অবস্থানে।
সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার একটি ইঙ্গিত দিল্লির পক্ষ থেকে পাওয়া গেলেও, তা কূটনৈতিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। সাধারণ মানুষের পর্যায়ে সেই বার্তা পৌঁছায়নি। এরই প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা—ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল দল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) থেকে ছেড়ে দেওয়া।
শেখ হাসিনার পতনের পরপরই বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের রাজনৈতিক মহল ও গণমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর গণহারে নির্যাতনের অভিযোগ তোলে ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এসব অভিযোগকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করে। এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের প্রভাব পড়ে দুই দেশের জনপর্যায়ে সম্পর্কেও।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় বাংলাদেশের সরকারি হাইকমিশনে উগ্র ভারতীয়দের ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ২০২৫ সালজুড়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে যায়। ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনার ধারাবাহিক বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য দেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে—এ অভিযোগ তুলে একাধিকবার ভারতীয় দূতকে তলব করে ঢাকা। জবাবে দিল্লিও বাংলাদেশের দূতকে তলব করে। কূটনৈতিক এই পাল্টাপাল্টি আচরণ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর তাঁর হত্যাকারী ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের দিকে বিক্ষোভ মিছিল হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন ভারতীয়রা। পরিস্থিতির অবনতি হলে নিরাপত্তাজনিত কারণে দুই দেশই ভিসা কার্যক্রম সীমিত করে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই খালেদা জিয়ার মৃত্যু দুই দেশের সম্পর্কে একটি নতুন মোড় এনে দেয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ব্যক্তিগত চিঠিতে শোক জানান। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে শোকযাত্রায় অংশ নেন। দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনে গিয়ে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ মিশনে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা শোক প্রকাশ করেন।
এই ঘটনাগুলোকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে তাঁদের মতে, সেই বার্তা এখনো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে সৌহার্দ্যের ইঙ্গিত থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই। আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানের বাদ পড়া সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক এখনো আস্থার সংকটে আটকে আছে। পাল্টাপাল্টি অবস্থান থেকে বেরিয়ে না এলে কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময়ে এই সম্পর্কের বরফ গলানো সম্ভব হবে না—এমনটাই মত সংশ্লিষ্টদের।
