Uncategorized

বায়ুদূষণে শীর্ষে ঢাকা, ধানমন্ডির বাতাস দুর্যোগপূর্ণ

শীতের মৌসুম প্রায় শেষের দিকে। তবে এখনো বাতাসে শুষ্কতা রয়ে গেছে, যার ফলে বেড়েছে ধুলিকণার উপস্থিতি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজধানীর বায়ুমানে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের তথ্যমতে, আজ বুধবার বেলা ১১টার রেকর্ডে ঢাকার বাতাসের মান ছিল ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’।বায়ুদূষণে শীর্ষে ঢাকা, ধানমন্ডির বাতাস দুর্যোগপূর্ণ

বিশ্বের ১২৭টি দেশের দূষিত শহরের তালিকায় আজ শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। আইকিউএয়ার জানায়, রাজধানীর এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) স্কোর ২৮৮, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ শ্রেণিভুক্ত।

ধানমন্ডিতে দূষণ সবচেয়ে ভয়াবহ

রিয়েল-টাইম একিউআই স্টেশন র‍্যাংকিং অনুযায়ী, ঢাকার কয়েকটি এলাকায় দূষণের মাত্রা পৌঁছেছে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ পর্যায়ে। এর মধ্যে ধানমন্ডির বাতাস সবচেয়ে বেশি দূষিত। একই অবস্থায় রয়েছে পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ি ও মিরপুরের দক্ষিণ পল্লবী এলাকা।

বায়ুদূষণে শীর্ষে ঢাকা, ধানমন্ডির বাতাস দুর্যোগপূর্ণ…..

এ ছাড়া যেসব এলাকায় বাতাসের মান সংবেদনশীল মানুষের জন্য অস্বাস্থ্যকর থেকে খুব অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—খিলক্ষেতের এএসএল সিস্টেম লিমিটেড এলাকা, ইস্টার্ন হাউজিং, বেজ এজওয়াটার আউটডোর, গোড়ান, পেয়ারাবাগ রেললাইন, গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এলাকা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোকাররম ভবনসংলগ্ন অঞ্চল।

পিএম ২.৫: নীরব ঘাতক

ঢাকার নিম্নমানের বাতাসের প্রধান কারণ হলো পিএম ২.৫ বা অতিক্ষুদ্র ধুলিকণা। এই কণাগুলোর ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারেরও কম, যা সহজেই ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে। ফলে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিসসহ বিভিন্ন শ্বাসযন্ত্রের রোগ এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালীন আবহাওয়ার ধরন, যানবাহন ও শিল্পকারখানা থেকে অনিয়ন্ত্রিত ধোঁয়া, চলমান নির্মাণকাজের ধুলো এবং আশপাশের ইটভাটাই এই দূষণ সংকটের মূল কারণ।

বিশ্বের অন্যান্য দূষিত শহর

আইকিউএয়ারের তালিকায় ঢাকার পর শীর্ষ পাঁচে থাকা অন্যান্য শহরগুলো হলো—মিশরের কায়রো (একিউআই ২৪০), ভারতের দিল্লি (২২৪), আফগানিস্তানের কাবুল (২১৮) এবং ভারতের কলকাতা (১৯১)।

বায়ুদূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, একিউআই ৫০-এর নিচে থাকলে বাতাস বিশুদ্ধ ধরা হয়। ২০১ থেকে ৩০০ হলে বাতাস ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০০ ছাড়ালে তা ‘দুর্যোগপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষ অকাল মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গৃহস্থালি ও পরিবেশগত বায়ুদূষণের সম্মিলিত প্রভাবে বছরে মারা যান প্রায় ৬৭ লাখ মানুষ।

সরকারের সতর্কবার্তা ও করণীয়

দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার বাতাস অতিমাত্রায় দূষিত থাকায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সবাইকে বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্ট বা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অতি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি ইটভাটা ও শিল্পকারখানার মালিকদের কঠিন বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করা, নির্মাণস্থলে ছাউনি ও বেষ্টনী স্থাপন, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা, পরিবহনের সময় ট্রাক ঢেকে নেওয়া এবং নির্মাণস্থলের আশপাশে দিনে অন্তত দুবার পানি ছিটানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে যা করবেন

  • অত্যন্ত সংবেদনশীলরা (শিশু, বয়স্ক, হৃদ্‌রোগী ও শ্বাসকষ্টের রোগী): ঘরের বাইরে না যাওয়াই উত্তম।
  • সাধারণ সুস্থ ব্যক্তি: বাইরে থাকার সময় কমান এবং ভারী শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন।
  • বাইরে বের হলে অবশ্যই কার্যকর মাস্ক ব্যবহার করুন।
  • ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখতে এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করুন এবং জানালা–দরজা বন্ধ রাখুন।

ঢাকার বায়ুদূষণ এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক গুরুতর হুমকি। দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *