শাহবাগে সংঘর্ষে রণক্ষেত্র, পুলিশের লাঠিপেটা ও টিয়ার শেল
শতাধিক আহত, গুলির অভিযোগ অস্বীকার করল পুলিশ ও সরকার
নির্বাচনের মাত্র পাঁচ দিন আগে রাজধানীর শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলন ঘিরে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পুলিশের লাঠিপেটা, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের, রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। তাঁদের অধিকাংশকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শাহবাগের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল মোড়ে এই সংঘর্ষের সূচনা হয়। পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। তবে পুলিশ ও অন্তর্বর্তী সরকার গুলিবর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে কেউ গুলিবিদ্ধ নন।
যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা, পুলিশের বাধা
ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে আন্দোলনে নামেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা। ৫০ দিন পূর্তিতে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে অংশ নেন নিহত হাদির স্ত্রীও।
শাহবাগে সংঘর্ষে রণক্ষেত্র, পুলিশের লাঠিপেটা ও টিয়ার শেল….
শুক্রবার বিকেলে শাহবাগ থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে পদযাত্রা শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। মিছিলটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল মোড়ে পৌঁছালে কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে পথরোধ করে পুলিশ। ব্যারিকেড ভেঙে এগোতে চাইলে পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করে। একপর্যায়ে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে, পরে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এ সময় আন্দোলনকারীরাও পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ও বোতল নিক্ষেপ করেন। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্যে বহু নেতাকর্মী আহত হন।
ঢাকা মেডিক্যালে শতাধিক আহত
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, ডাকসু নেত্রী ফাতেমা তাসনিম জুমা, জকসু নেত্রী শান্তা আক্তারসহ শতাধিক আহত চিকিৎসা নিচ্ছেন।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, রাত ১১টা পর্যন্ত ৬৫ জন আহত রোগী হাসপাতালে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন ভর্তি রয়েছেন এবং কয়েকজন পর্যবেক্ষণে আছেন। অধিকাংশের শরীরে থেঁতলে যাওয়া ও ফেটে যাওয়ার মতো আঘাত রয়েছে।
শাহবাগ অবরোধ ও যানজট
সংঘর্ষের পর আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে সন্ধ্যায় শাহবাগে অবস্থান নেন। শহীদ ওসমান হাদি চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগানে এলাকা উত্তাল করে তোলেন তাঁরা। প্রায় ছয় ঘণ্টা শাহবাগ মোড় অবরোধ থাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
অবস্থান কর্মসূচিতে আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, “বিচারের স্পষ্ট আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত আমরা শহীদ ওসমান হাদির স্ত্রীকে নিয়ে অবস্থান চালিয়ে যাব। জাতিসংঘের অধীনে নিরপেক্ষ তদন্তের ঘোষণা না এলে আন্দোলন চলবে।”
পুলিশের ও সরকারের বক্তব্য
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী জানান, নিষিদ্ধ এলাকায় ব্যারিকেড ভেঙে যমুনা ঘেরাওয়ের চেষ্টা করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।
ডিএমপির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যমুনা এলাকায় কোনো আগ্নেয়াস্ত্র বা গুলি ব্যবহার করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারও একই দাবি করে জানায়, মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগ সঠিক নয়। সরকার জানিয়েছে, ৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হবে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য ঘটনা
সংঘর্ষের ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ও আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি) উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে।
এদিকে, শাহবাগে পুলিশের হামলার প্রতিবাদে রাতে ডাকসু ভবনের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে ডাকসু। ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, “বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর এমন আচরণ নিন্দনীয়।”
চট্টগ্রামেও ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা ষোলশহর এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
পরবর্তী কর্মসূচি
রাত সাড়ে ১০টার দিকে আবদুল্লাহ আল জাবেরের নির্দেশে আন্দোলনকারীরা শাহবাগ ত্যাগ করেন। ইনকিলাব মঞ্চ জানিয়েছে, আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আজ সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে।
