Uncategorized

উত্তরের ভোটের বড় ইস্যু তিস্তা: কী চান নদীপাড়ের মানুষ?

তিস্তা শুধু ভাঙেই। শীতকালেও থেমে নেই নদীটির ভাঙন। গত এক মাস ধরে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়নের দক্ষিণ বালা পাড়া গ্রামের সামনে তিস্তার তীব্র ভাঙনে একের পর এক চর ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। গ্রামবাসীর আশঙ্কা, আর পাঁচ-সাত দিনের মধ্যেই ভাঙন মূল গ্রামে আঘাত হানতে পারে।

সম্প্রতি দক্ষিণ বালা পাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পশ্চিম থেকে পূর্বমুখী তিস্তার গতিপথ সামান্য বদলে গ্রামের দিকে ঝুঁকেছে। নদীর ধারে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে বালুর চর ভেঙে পড়ার দৃশ্য। সেচযন্ত্রের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ‘ঝপ ঝপ’ শব্দে নদীতে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি।

উত্তরের ভোটের বড় ইস্যু তিস্তা: কী চান নদীপাড়ের মানুষ?…..

গ্রামের বাসিন্দা মো. আবু বক্কার সিদ্দিকী প্রায় তিন বিঘা জমিতে সূর্যমুখী ও রসুন চাষ করেছেন। কিন্তু ভাঙন থামানো না গেলে তাঁর ফসলও তিস্তায় চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, “গ্রামের সামনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ আছে। ভাঙন বাঁধ পর্যন্ত না এলে সরকার কিছুই করে না।”

আবু বক্কার সিদ্দিকীর জীবনে তিস্তার ক্ষত নতুন নয়। ১৯৯২ সালে নদীগর্ভে বিলীন হয় তাঁর বসতভিটা ও ১২ বিঘা জমি। ৫০ বছরের জীবনে তাঁকে দুবার নতুন করে ঘর তুলতে হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে চান তিনি, কিন্তু ক্ষোভ ঝরে পড়ে কণ্ঠে—
“সরকার বলে তিস্তা খনন করবে, মহাপরিকল্পনা করবে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় না।”

তাঁর জমির পাশেই বালুর ওপর তামাক পাতা শুকাচ্ছিলেন মোর্শেদা বেগম ও তাঁর স্বামী মুজিবুর রহমান। বয়স ষাট পেরিয়েছে দুজনেরই। মোর্শেদা বেগম বলেন, “বিয়ের পর থেকে ২৫ বার বাড়ি ভেসে গেছে তিস্তায়।”

দক্ষিণ বালা পাড়া, বারোঘরিয়া ও গোবর্ধন—এই তিনটি পাশাপাশি গ্রামে স্থায়ী ঘরবাড়ি প্রায় নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ ঘর টিনের, অস্থায়ী। গোবর্ধন গ্রামের তামাকচাষি রাশেদুল ইসলাম বলেন, “স্থায়ী ঘর বানানোর সাহস নেই। বউ-বাচ্চা নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকা যায় না।”

দারিদ্র্যের শিকড়ে তিস্তার ভাঙন

লালমনিরহাট জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আবু হাসনাত রানা বলেন, তিস্তার ভাঙনের কারণেই উত্তরাঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্য ঘুচছে না। তাঁর মতে, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু। বাংলাদেশ, ভারত ও চীন—সব পক্ষের সম্মতি প্রয়োজন।”

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হিমালয়ের সিকিম অঞ্চল থেকে উৎপন্ন তিস্তা নদী ভারতের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৫ কিলোমিটার, যা নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্রে মিলেছে।

‘তিস্তা নদী: পরিবেশগত সংকট ও পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, উজানে ভারতীয় অংশে একাধিক বাঁধের কারণে বাংলাদেশ অংশে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানিপ্রবাহ কমেছে ৮০–৯০ শতাংশ। এতে কৃষি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩০০ শতাংশ। অন্যদিকে বর্ষায় অতিরিক্ত পানিতে বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। শুধু ২০২০ সালেই তিস্তার দুই তীর থেকে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

ভোটারদের চাওয়া কী?

মহিষখোঁচা বাজারের একটি চায়ের দোকানে কাজ করেন ২৫ বছর বয়সী মো. উজ্জ্বল মিয়া। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে কেন্দ্রে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। এবার তিনি নিজের ভোট নিজে দিতে চান।

উজ্জ্বলসহ প্রায় সব শ্রেণির মানুষ মনে করেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। তবে অধিকাংশ মানুষই জানেন না, এই মহাপরিকল্পনায় আসলে কী আছে।

স্থানীয়দের ধারণা অনুযায়ী, মহাপরিকল্পনায় নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ, চর জাগানো, এমনকি নদীর পাড়ে কলকারখানা ও স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। নদী খননের দিকটিতেই মানুষের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। রাশেদুল ইসলাম বলেন, “খনন হলে চর জাগবে, জমি ফেরত পাওয়া যাবে, কৃষি বাড়বে।”

সরকারের ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’—যা তিস্তা মহাপরিকল্পনা নামে পরিচিত—এর আওতায় নদী খনন, ভূমি উদ্ধার, বাঁধ নির্মাণ ও উন্নয়ন কাজের কথা বলা হয়েছে।

রাজনীতির কেন্দ্রে তিস্তা

তিস্তা এখন আর শুধু পাঁচ জেলার সমস্যা নয়; এটি পুরো উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণায় তিস্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

লালমনিরহাট জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. আবু তাহের বলেন, “তিস্তা সমস্যার সমাধানে যা দরকার, আমরা করব। চীনের সঙ্গেও এ বিষয়ে কাজ করতে প্রস্তুত।”

বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিএনপির অগ্রাধিকার। আমরা পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং তিস্তাপারের দুই কোটি মানুষের দুর্দশা লাঘবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

ভোটের মাঠে প্রতিশ্রুতি অনেক। কিন্তু তিস্তাপারের মানুষের প্রশ্ন একটাই—এবার কি সত্যিই বাস্তবায়ন হবে মহাপরিকল্পনা, নাকি নদীর মতোই ভেসে যাবে প্রতিশ্রুতিগুলো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *