Saturday, April 25, 2026
Latest:
Uncategorized

ভবন তদারকির ঘাটতি, ভূমিকম্পে বাড়ছে বাংলাদেশের ঝুঁকি

ঢাকা, ২৪ এপ্রিল: দেশে ভবন নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত আইন-কানুন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগের ঘাটতি এবং তদারকির অভাবে বাংলাদেশ ক্রমেই ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে পড়ছে—এমনই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

শুক্রবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ‘ভূমিকম্প : পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা বলেন, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে বিদ্যমান বিল্ডিং কোড ও আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে ভূমিকম্পের সময় বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

ভবন তদারকির ঘাটতি, ভূমিকম্পে বাড়ছে বাংলাদেশের ঝুঁকি…………

‘প্রগতিশীল প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি সমাজ’-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে বক্তারা ভবনের গুণগত মান নিশ্চিত করতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিদর্শন, প্রকৌশলীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আলাদা বাজেট বরাদ্দের ওপর গুরুত্ব দেন।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের আহ্বায়ক মীর মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। তিনি জানান, গত ছয় মাসে দেশে শতাধিক ছোট-বড় ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। তবে দেশে পর্যাপ্ত সিসমিক তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি থাকায় ঝুঁকি নিরূপণ আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, সিসমোগ্রাফ পরিচালনায় প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ভূতাত্ত্বিক তথ্য ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতার কারণে সঠিক বিশ্লেষণ ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা, বিল্ডিং কোড হালনাগাদ, নকশা যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার করা এবং এলাকা-ভিত্তিক প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল গঠনের পরামর্শ দেন তিনি।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, দেশে ভবন নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৬০টি আইনি কাঠামো থাকলেও সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ খুবই সীমিত। তার মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। বিজ্ঞানভিত্তিক নগর পরিকল্পনা, বিল্ডিং কোডের কঠোর প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার সাব্বির আহমেদ বলেন, “ভূমিকম্পে মানুষ সরাসরি মারা যায় না, বরং দুর্বল ভবন ধসে প্রাণহানি ঘটে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যা ছাড়া কোনো উদ্যোগই কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে তিনটি টেকটোনিক প্লেট—ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মিজ প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ভূমিকম্পপ্রবণ। দেশের উত্তরাঞ্চলের ডাউকি ফল্ট এবং পূর্বাঞ্চলের চিটাগাং কোস্টাল ফল্ট অতীতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের উৎস হিসেবে পরিচিত।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মাটির প্রকৃতি নরম হওয়ায় ভূমিকম্পের কম্পন বেশি অনুভূত হয় এবং ঘনবসতির কারণে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তবে যথাযথ প্রস্তুতি ও সচেতনতা থাকলে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

সেমিনারে বক্তারা আরও জানান, রাজধানী ঢাকায় প্রায় ছয় লাখ ভবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। রাজউকের ডিজিটাল ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অনুমোদন পেতে ঘুষ ও জটিলতার অভিযোগও উঠে আসে।

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত—আইন রয়েছে, প্রয়োজন শুধু তার কঠোর প্রয়োগ, সুশাসন এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। তা না হলে ভবিষ্যতের কোনো বড় ভূমিকম্প দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *