ইরানে নতুন করে হামলা হলে বিশ্ববাজারে ভয়াবহ প্রভাবের আশঙ্কা
ইরানের ওপর নতুন করে সামরিক হামলা চালানো হলে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তাঁর আশঙ্কা, ইসরাইলের উসকানিতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানে নতুন করে হামলা হলে বিশ্ববাজারে ভয়াবহ প্রভাবের আশঙ্কা…..
বুধবার দেওয়া এক বার্তায় আরাঘচি বলেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যেকোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর পাশাপাশি ভোক্তারাও সংকটে পড়তে পারেন।
এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে কথিত ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বুধবার তাঁর এই বক্তব্যের পর ইরানকে ঘিরে নতুন করে সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এদিকে রাশিয়ার মস্কোয় অনুষ্ঠিত গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর ফোরামের (জিইসিএফ) শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন আরাঘচি। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শেয়ারবাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে ক্ষয়ক্ষতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মাত্রা নির্ভর করবে হামলার ধরন, ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ এবং সংঘাত কতটা বিস্তৃত হয়, তার ওপর।
তেলের বাজারে অস্থিরতার শঙ্কা
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি ইরান। দেশটির তেল উৎপাদন ও রপ্তানি নতুন করে হামলার মুখে পড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশের স্থাপনা ও পরিবহনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতিতে। তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা পরিচালনা এবং পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগকারী এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়। সংঘাতের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
শুধু তেলের দাম বৃদ্ধিই নয়, জাহাজের বিমা প্রিমিয়াম ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পৌঁছানোর খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও চাপ
তেলের পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী অঞ্চল। বিশেষ করে কাতারের এলএনজি রপ্তানি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইরানকে ঘিরে সংঘাত বিস্তৃত হলে অথবা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। এতে এশিয়া ও ইউরোপের আমদানিকারক দেশগুলো বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য প্রতিযোগিতায় নামতে পারে।
সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকবে। এর প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সারশিল্প ও অন্যান্য জ্বালানিনির্ভর খাতে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামও বাড়তে পারে।
শেয়ারবাজার ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব
আন্তর্জাতিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগ কমিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে দরপতন ও লেনদেনে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে বিমান পরিবহন, পর্যটন, উৎপাদনশিল্প এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে বিমান চলাচল ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যায়, যা এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, তেলের দাম বাড়লে কিছু জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাভবান হতে পারে। তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এতে সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
স্বর্ণ ও ডলারের বাজারে পরিবর্তন
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও সামরিক অনিশ্চয়তা বাড়লে স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে পারে। অনেক বিনিয়োগকারী সংকটের সময় সম্পদের মূল্য ধরে রাখতে স্বর্ণের মতো নিরাপদ বিবেচিত বিনিয়োগের দিকে ঝোঁকেন। তবে স্বর্ণের দাম কতটা বাড়বে, তা ডলারের মূল্য, সুদের হার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করবে।
একইভাবে, অনিশ্চয়তার সময়ে ডলারের চাহিদা বাড়লে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি অনুভূত হতে পারে।
ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মান কমে গেলে জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
পরিবহন ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি
সামরিক সংঘাতের কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে ঝুঁকি বাড়লে জাহাজের বিমা খরচ বেড়ে যেতে পারে। নিরাপত্তার কারণে জাহাজকে বিকল্প পথে চলাচল করতে হলে পণ্য পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে এবং পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে।
এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায়। জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়লে খাদ্যপণ্য, রাসায়নিক দ্রব্য, সার এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।
এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরও পড়তে পারে। ফলে বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি নতুন করে বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার ও মুদ্রানীতি পরিচালনাও আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে বাড়তি অনিশ্চয়তা
ইরানকে ঘিরে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে এর প্রভাব নির্ভর করবে সংঘাতের ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্বের ওপর। তবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার অভিঘাত বিশ্বজুড়েই ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোকে বাড়তি ব্যয়, মুদ্রার ওপর চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক বাজারেও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তার ওপর নির্ভর করবে বিশ্ববাজারে এই সংকটের প্রভাব কতটা গভীর হবে।
