Tuesday, February 24, 2026
Latest:
Uncategorized

প্রাসাদবন্দি দিন পেরিয়ে রাষ্ট্রপতির বিস্ফোরক বক্তব্য: অন্তর্বর্তী সরকার, জরুরি অবস্থা ও দেড় বছরের চাপের অন্তরালে

টানা দেড় বছর যেন এক অদৃশ্য অবরোধে কাটিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকার পতন, অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার সূচনা, জরুরি অবস্থা জারির চাপ, এমনকি ব্যক্তিগত চিকিৎসা নিয়েও বিধিনিষেধ—সব মিলিয়ে সময়টিকে তিনি বর্ণনা করলেন “শ্বাসরুদ্ধকর” অধ্যায় হিসেবে। বঙ্গভবনে দেওয়া একান্ত আলাপচারিতায় তিনি তুলে ধরলেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের অজানা অনেক দিক।

সরকার পতনের দিন: দ্রুত বদলে যাওয়া দৃশ্যপট

রাষ্ট্রপতি জানান, ৫ আগস্ট দুপুরে পরিস্থিতি হঠাৎ করেই ভয়াবহ মোড় নেয়। প্রথমে জানানো হয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গভবনে আসতে পারেন। নিরাপত্তা প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই জানা যায়, তিনি দেশত্যাগ করেছেন। পুরো ঘটনাপ্রবাহ ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে পাল্টে যায়।

প্রাসাদবন্দি দিন পেরিয়ে রাষ্ট্রপতির বিস্ফোরক বক্তব্য: অন্তর্বর্তী সরকার, জরুরি অবস্থা ও দেড় বছরের চাপের অন্তরালে…..

বিকেলে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান ফোনে পরিস্থিতি অবহিত করেন। পরে তিন বাহিনীর প্রধান বঙ্গভবনে এসে বৈঠক করেন। আলোচনায় উঠে আসে তিনটি বিকল্প—তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সর্বদলীয় সরকার বা অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘ আলোচনার পর ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয় এবং জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার দায়িত্ব পড়ে রাষ্ট্রপতির ওপর।

জরুরি অবস্থা জারির চাপ ও ‘প্রতিবিপ্লবের’ আশঙ্কা

রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় বিভিন্ন মহল থেকে তাঁর ওপর জরুরি অবস্থা জারির চাপ ছিল। তিনি দাবি করেন, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পক্ষ অসাংবিধানিক সমাধানের দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিল। তবে সেনাবাহিনীসহ সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব সামরিক শাসন বা জরুরি অবস্থার বিপক্ষে অবস্থান নেয়।

তিনি বলেন, “চাইলেই মার্শাল ল হতে পারত, কিন্তু তারা সে পথে যায়নি।” তাঁর দাবি, সেনাপ্রধান ক্ষমতার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন না; বরং দ্রুত নির্বাচনের দিকেই এগোতে চেয়েছেন।

সাংবিধানিক সংকট ও আপিল বিভাগের মতামত

অন্তর্বর্তী সরকার গঠন নিয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—সংবিধানে এর স্পষ্ট উল্লেখ নেই। রাষ্ট্রপতি জানান, তিনি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের মতামত চান। শুনানির পর আদালত মত দেয় যে বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করতে পারেন। সেই মতামতই তাঁর জন্য “রক্ষাকবচ” হয়ে ওঠে।

প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন: অনড় ছাত্রসমাজ

রাষ্ট্রপতি জানান, ছাত্রদের পক্ষ থেকে একমাত্র নাম ছিল মুহাম্মদ ইউনূস। সে সময় তিনি ফ্রান্সে চিকিৎসাধীন থাকায় যোগাযোগে সমস্যা হচ্ছিল। বিকল্প হিসেবে সাবেক অর্থনীতিবিদ সালেহউদ্দিন আহমেদ-এর নামও আলোচনায় আসে। কিন্তু ছাত্রনেতারা ড. ইউনূসের ব্যাপারে অনড় থাকেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর দেশে ফেরা নিশ্চিত হলে উপদেষ্টা তালিকা চূড়ান্ত হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।

মব সন্ত্রাস ও নীরবতা

দেশজুড়ে সহিংসতা ও মব সংস্কৃতি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, “অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে।” তিনি স্বীকার করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কঠোরতা শুরুতে চোখে পড়েনি। তবে পরবর্তীকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থানকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন।

নির্বাচন ও নতুন সরকার নিয়ে মূল্যায়ন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, “নির্বাচন ভালো হয়েছে, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল।” নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, “রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণাবলি রয়েছে, আশাবাদী হওয়া যায়।”

নতুন সরকার আসার পর নিজের অবস্থান প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি ২০২৮ সাল পর্যন্ত সাংবিধানিকভাবে দায়িত্বে থাকবেন। তবে নির্বাচিত সরকার চাইলে সম্মানজনকভাবে সরে দাঁড়াতে প্রস্তুত আছেন।

‘প্রাসাদবন্দি’ জীবনের অভিযোগ

রাষ্ট্রপতি অভিযোগ করেন, দেড় বছর তাঁকে কার্যত গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় জাতীয় ঈদগাহে যেতে দেওয়া হয়নি। বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার অনুপস্থিতিকেও তিনি ‘সৌজন্যবোধের ঘাটতি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের Singapore National University Hospital ও লন্ডনের Cambridge Parkway Hospital-এ নির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকলেও বিদেশযাত্রার অনুমতি পাননি বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, “মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভেঙে ফেলার চেষ্টা ছিল।”


দীর্ঘ আলাপচারিতায় রাষ্ট্রপতি স্পষ্ট করেছেন—দেড় বছরের চাপ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও ব্যক্তিগত অপমানের মধ্যেও তিনি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এখন তিনি নিজেকে “সম্পূর্ণ চাপমুক্ত” বলে দাবি করছেন। তবে তাঁর এই বিস্ফোরক বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় তুলবে—এটা বলাই যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *