রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের জোর গুঞ্জন, উত্তরসূরি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন—এমন আলোচনা এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালোভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, তিনি শারীরিক অসুস্থতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
সরকার ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়ে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি কে হতে পারেন, তা নিয়েও ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের জোর গুঞ্জন, উত্তরসূরি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা…………
বিএনপির একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সম্ভাবনা অত্যন্ত জোরালো। অন্যদিকে বঙ্গভবন সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতি ইতোমধ্যে তাঁর অধস্তন কর্মকর্তাদের শিগগিরই বঙ্গভবন ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। পদত্যাগের পর তিনি কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসার জন্য বিদেশেও যেতে পারেন।
উত্তরসূরি নিয়ে চলছে আলোচনা
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যে কয়েকটি নাম আলোচনায় এসেছে। এর আগে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও আবদুল মঈন খানের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শোনা গেলেও বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালনকারী একজন সচিবের নাম নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।
তবে খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, তিনি এমন কোনো আলোচনা সম্পর্কে অবগত নন। তাঁর ভাষায়, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে স্বাভাবিকভাবেই অনেক নাম আলোচনায় আসবে।
সংবিধান কী বলছে
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালন করতে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
এ ছাড়া সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
রাজনৈতিক গুরুত্ব
নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালেই পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা শুধু সাংবিধানিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, নতুন রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনকালীন সম্ভাব্য রাজনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন এবং পরবর্তী সময়ে সংসদ ভেঙে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়।
গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক সংগঠন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ও বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছিল। তবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে অপসারণের কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পটভূমিতে ভিন্নতা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হলেও সরকার পরিবর্তনের পরও মো. সাহাবুদ্দিন দায়িত্বে বহাল ছিলেন। তবে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা চলছিল।
অতীত বিতর্ক
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার সময়ও নানা আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছিল। তিনি ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় ব্যাংক দুটি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যার কারণে তাঁর ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও সমালোচনা ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে নিয়ে নানা আলোচনা ছিল।
এখন অপেক্ষা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার
যদিও বিভিন্ন সূত্র রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের বিষয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছে, তবু এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনের নজর এখন বঙ্গভবনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং সম্ভাব্য নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়ার দিকে।
