Tuesday, February 17, 2026
Latest:
Uncategorized

কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর নয়, গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রার সূচনা: জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস

অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় মুহূর্তে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রার সূচনা। তাঁর ভাষায়, “এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে।”

দীর্ঘ ১৭ বছর পর আয়োজিত এই নির্বাচনকে তিনি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত, তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে এবারের ভোট—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

১৮ মাসের দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ

প্রায় ১৮ মাস দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে বিদায় নেওয়া তাঁর জন্য গৌরবের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে তিনি দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার অনিশ্চয়তা ও সংকটের কথা উল্লেখ করেন। প্রশাসনের ভেতরে আস্থাহীনতা, অস্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার মধ্যে সরকারকে পথচলা শুরু করতে হয়েছিল বলে জানান তিনি।

কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর নয়, গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রার সূচনা: জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস…..

তিনি বলেন, “যতই নিপীড়ন ও সহিংসতার তথ্য সামনে এসেছে, ততই সংকটের গভীরতা স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু সেই অস্থির সময় পেরিয়ে আমরা একটি অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পেরেছি।”

হার-জিতের মধ্যেই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য

নির্বাচনে জয়ী ও পরাজিত সব প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।” তিনি উল্লেখ করেন, জয়ী প্রার্থীরা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন, আর পরাজিতরাও প্রায় সমানসংখ্যক ভোট পেয়েছেন—যা দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য ও বহুমতের প্রতিফলন।

সংস্কার ও জবাবদিহির পথচলা

গণ-অভ্যুত্থানের সময় তরুণদের যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—এ কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার অধিকাংশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত।

তিনি বলেন, এসব পদক্ষেপ নাগরিক অধিকার সংহত করেছে, বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে এবং গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় আনতে নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

‘ফ্যাসিবাদ আর নয়’

অতীতের দুঃশাসন ও নিপীড়নের প্রসঙ্গ টেনে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজন মৌলিক ও গভীর সংস্কার। বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার ছিল বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, একাধিক ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে এবং কয়েকটি মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

‘জুলাই সনদ’—সবচেয়ে বড় অর্জন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে প্রণীত ‘জুলাই সনদ’কে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন অধ্যাপক ইউনূস। গণভোটে জনগণের বিপুল সমর্থন পাওয়া এই সনদ বাস্তবায়িত হলে ফ্যাসিবাদের পথ চিরতরে বন্ধ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি

পররাষ্ট্রনীতিতে সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করে নোবেল বিজয়ী এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বাংলাদেশ এখন আর নতজানু পররাষ্ট্রনীতির পথে হাঁটে না। বরং ভারসাম্যপূর্ণ ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তিনি বলেন, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার, সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করার ভিত্তি তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও শুল্কচুক্তিকে তিনি কৌশলগত অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

গণতন্ত্রের পথচলা অব্যাহত রাখার আহ্বান

ভাষণের শেষাংশে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিলেও গণতন্ত্র, জবাবদিহি, বাক্‌স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার চর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে, তা যেন কখনো থেমে না যায়।

“রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার,”—উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান একটি নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। সেই স্বপ্ন ও শক্তিকে ধারণ করতে পারলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *