বড়লেখার সরকারি নিউ সমনবাগ চা–বাগানে ‘ভূতুড়ে’ শ্রমিক কেলেঙ্কারি, বছরে ক্ষতি প্রায় ১২ কোটি টাকা
মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সরকারি নিউ সমনবাগ চা-বাগানে ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। খাতায়-কলমে যাঁরা সক্রিয় শ্রমিক, তাঁদের মধ্যে অন্তত ৪০ জন বহু আগেই মারা গেছেন, অবসরে গেছেন বা বাস্তবে তাঁদের কোনো অস্তিত্বই নেই। অথচ নিয়মিত তাঁদের নামে হাজিরা দেখিয়ে তোলা হচ্ছে বেতন-ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও রেশন।
সম্প্রতি চা বোর্ডের ছয় সদস্যের একটি তদন্ত দল সরেজমিন অনুসন্ধানে গিয়ে এসব তথ্য উদ্ঘাটন করে। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে টানা নয় দিন তাঁরা বাগানের নথিপত্র যাচাই করেন। প্রভিডেন্ট ফান্ডের হিসাব, রেশন তালিকা, নিয়োগপত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্র মিলিয়ে দেখার সময় একের পর এক অসংগতি ধরা পড়ে।
মৃত শ্রমিকও ‘সক্রিয়’ তালিকায়
২১ ফেব্রুয়ারি বাগানে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দ্বীপনারায়ণ, শচীন, সুজন ও কবিতা নামে তালিকাভুক্ত চার শ্রমিক কয়েক বছর আগেই মারা গেছেন। কিন্তু সরকারি নথিতে তাঁরা এখনো কর্মরত। শুধু তাই নয়, তাঁদের নামে নিয়মিত হাজিরা ও বেতন তোলার প্রমাণও মিলেছে।
বড়লেখার সরকারি নিউ সমনবাগ চা–বাগানে ‘ভূতুড়ে’ শ্রমিক কেলেঙ্কারি, বছরে ক্ষতি প্রায় ১২ কোটি টাকা…..
সরকারি চারটি চা–বাগানের মধ্যে আয়তন ও শ্রমিকসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় এই বাগান। প্রায় ২ হাজার ৯৬ একর আয়তনের বাগানটিতে কাজ করার কথা ১ হাজার ৮২০ শ্রমিকের। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র ৩১৫ জনের তথ্য পুরোপুরি সঠিক পাওয়া গেছে।
ভয়াবহ অসংগতি
তদন্তে উঠে এসেছে—
- ১,৮২০ শ্রমিকের মধ্যে অন্তত ৪০ জন মৃত, অবসরপ্রাপ্ত বা অস্তিত্বহীন।
- আরও ১৭০ জন ভুয়া নাম-ঠিকানায় বেতন তুলছেন।
- ১,১৬০ জনের নিয়োগপত্রের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের মিল নেই।
- ৮০ জনের বয়স ৬০ বছরের বেশি, যাঁদের অনেক আগেই অবসরে যাওয়ার কথা।
সব মিলিয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ড, রেশন, বোনাস এবং বাগানের জমি ভোগসহ নানা সুবিধার মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে বলে জানিয়েছে চা বোর্ড। বছরে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ কোটি টাকা।
তদন্ত দল অবরুদ্ধ
তদন্ত শেষে গত ১৩ জানুয়ারি ফেরার পথে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, ‘ভুয়া’ শ্রমিকদের একটি সংঘবদ্ধ দল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তদন্ত দলের সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখে এবং তাঁদের বহনকারী গাড়িতে হামলা চালায়।
তদন্ত দলের সদস্য মো. রাজিবুল হাসান বলেন, তালিকা ধরে শ্রমিকদের যাচাই শুরু করতেই ‘ভূতুড়ে’ শ্রমিকদের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রকৃত শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতেই এই অনুসন্ধান চালানো হয়।
পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদনে বাগানের পঞ্চায়েত সমিতির বিরুদ্ধে অবৈধ শ্রমিকদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সমিতির সভাপতি মহনলাল রিকমুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বাগানের ব্যবস্থাপকও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সব মিলিয়ে বড়লেখার এই সরকারি চা–বাগানে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র এখন প্রকাশ্যে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
