আগস্টে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত ২৮, আহত ৬২
চলতি বছরের আগস্টে সারা দেশে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৫৩টি ঘটনায় ২৮ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৬২ জন। একই সময়ে দেশে ৭০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় সাতজন নিহত এবং ৫৩৬ জন আহত হয়েছেন।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) আগস্ট মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আগস্টে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত ২৮, আহত ৬২….
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সহিংসতার পেছনে দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, হামলা ও চাঁদাবাজির মতো বিষয়গুলো প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে। জুলাইয়ে ৪৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ১৬৪ জন আহত হয়েছিলেন। সে তুলনায় আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
দলীয় কোন্দলে বেড়েছে সহিংসতা
আগস্টে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে ২০টি সহিংসতার ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং ১৫২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ১৮টি সংঘর্ষে একজন নিহত ও ২৩৩ জন আহত হন।
এ ছাড়া বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সাতটি সংঘর্ষে একজন নিহত এবং ২৬ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে ছয়টি সংঘর্ষে ১৬ জন আহত হন। বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৮ জন। বিভিন্ন দলের মধ্যে আরও নয়টি ঘটনায় ৭১ জন আহত হয়েছেন।
আগস্টে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত ২৮, আহত ৬২…..
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত সাতজনের মধ্যে বিএনপির পাঁচজন, আওয়ামী লীগের একজন এবং জামায়াতের একজন রয়েছেন।
ক্যাম্পাসেও সংঘর্ষ
আগস্টে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘর্ষও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এ ধরনের অন্তত ১৩টি ঘটনায় ২১৬ জন আহত হয়েছেন।
এর মধ্যে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের আটটি ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৮১ জন। অন্যদিকে ছাত্রদল, অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঁচটি সংঘর্ষে ৩৫ জন আহত হয়েছেন।
আগস্টে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত ২৮, আহত ৬২….
রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি আগস্টে অন্তত ১৯টি ঘটনায় বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরায় সংঘর্ষে নয়জন আহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক মামলায় হাজারো মানুষ আসামি
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৬২টির বেশি রাজনৈতিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১ হাজার ১২৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ২ হাজার ২০৯ জনকে।
আগস্টে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত ২৮, আহত ৬২….
এ ছাড়া রাজনৈতিক ও অন্যান্য ঘটনায় ১৬২টি পৃথক ঘটনায় মোট ১২ হাজার ৮২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪২৯ জন, বিএনপির ২২ জন, জামায়াতের চারজন, এনসিপির নয়জন এবং উগ্রপন্থি সংগঠনের পাঁচজন সদস্য রয়েছেন।
মব সহিংসতায় নিহত ২৮
আগস্টে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগ্বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে ৫৩টি গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৮ জন নিহত এবং ৬২ জন আহত হয়েছেন।
আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে কাউকে শাস্তি দেওয়ার এই প্রবণতা জননিরাপত্তা ও আইনের শাসনের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিক নির্যাতনও বেড়েছে
আগস্টে ৩২টি ঘটনায় ৪৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬ জন আহত, ছয়জন লাঞ্ছিত, সাতজন হুমকির শিকার এবং পাঁচজন আটক হয়েছেন।
এ ছাড়া সংবাদ প্রকাশের জেরে দায়ের করা একটি মামলায় একজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের চিত্র
আগস্টে ২৪৯ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৭৯ জন, যাদের মধ্যে ৪৬ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
এ ছাড়া গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮ জন এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৯৩ জন নারী ও কন্যাশিশু। পারিবারিক সহিংসতায় ৪৯ জন নারী নিহত, ৩১ জন আহত এবং ২৩ জন আত্মহত্যা করেছেন।
শ্রমিক নির্যাতন ও কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু
আগস্টে ৮৪টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং ৬৭ জন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৩ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
সীমান্তেও প্রাণহানি
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে এইচআরএসএস। আগস্টে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের হামলায় দুজন নিহত এবং একজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছেন।
‘মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক’
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, আগস্টে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সংবেদনশীল ও উদ্বেগজনক পর্যায়ে ছিল।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা, ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ, মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের মতো ঘটনা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
