বাংলাদেশ

র‌্যাবের স্টিকারযুক্ত গাড়িতে জবির প্রাক্তন নারী শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা

রাজধানীর পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় একটি মেস থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) এক প্রাক্তন নারী শিক্ষার্থীকে র‌্যাবের স্টিকারযুক্ত গাড়িতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সাদাপোশাকে থাকা ব্যক্তিদের কাছে পরিচয়পত্র বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখতে চাওয়ার পরও তা দেখানো হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ওই নারী। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে তাঁকে নিয়ে যেতে পারেননি তাঁরা।

র‌্যাবের স্টিকারযুক্ত গাড়িতে জবির প্রাক্তন নারী শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা…

পরে সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার জানান, মেসে যাওয়া ব্যক্তিরা র‌্যাব-২-এর সদস্য ছিলেন। একটি মামলার অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁরা ওই নারীকে নিতে গিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

ঘটনাটি ঘটে ৬ সেপ্টেম্বর ভোরে। ভুক্তভোগী মমতাজ আরা বর্ষা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর দুই সহপাঠীর ভাষ্য, তিনি ২০২৩ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

পারিবারিক বিরোধের জেরে হয়রানির অভিযোগ

ঘটনার পর বিকেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাশহীদ রফিক ভবনের নিচে সংবাদ সম্মেলন করেন মমতাজ আরা বর্ষা। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর ছোট বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়া পারিবারিক বিরোধের জেরে তাঁকে হয়রানি করছেন এবং র‌্যাবের সঙ্গে তাঁর পূর্বপরিচয় ব্যবহার করে তাঁকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

র‌্যাবের স্টিকারযুক্ত গাড়িতে জবির প্রাক্তন নারী শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা…..

মমতাজ বলেন, চলতি বছরের মে মাসে তাঁর ছোট বোনের সঙ্গে সুমন মিয়ার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকেই সুমন তাঁদের পরিবারকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও হুমকি দিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ তাঁর।

তিনি আরও বলেন, গত আগস্টে দিনাজপুরের জজকোর্টে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সুমন মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এরপর থেকেই ফোন ও মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়ে তাঁকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।

মমতাজের ভাষ্য, সুমন দীর্ঘদিন র‌্যাবের আইটি বিভাগে কাজ করেছেন। সেই পরিচয় ব্যবহার করেই তাঁকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে তাঁর সন্দেহ।

‘ওয়ারেন্ট দেখাতে বললেও দেখানো হয়নি’

সকালের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মমতাজ বলেন, ভোরে সাদাপোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁদের ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়েন। অপরিচিত হওয়ায় প্রথমে তাঁরা দরজা খুলতে চাননি। পরে ওই ব্যক্তিরা নিজেদের র‌্যাব সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন।

মমতাজের অভিযোগ, পরিচয়পত্র, মামলার কাগজ বা কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখানো হয়নি। বরং তাঁকে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাসায় তল্লাশিও চালানো হয়।

র‌্যাবের স্টিকারযুক্ত গাড়িতে জবির প্রাক্তন নারী শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা….

তিনি বলেন, বারবার পরোয়ানা দেখাতে বলা হলেও তা দেখানো হয়নি। একপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আশপাশের লোকজন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানতে পারেন।

মমতাজ বলেন, ‘‘ওয়ারেন্ট ছাড়া কীভাবে আমাকে তুলে নিতে চায়? এ ঘটনায় আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। আমি আমার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।’’

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, নারী সদস্য ছাড়া র‌্যাবের পুরুষ সদস্যরা কীভাবে একটি নারীদের মেসে তল্লাশি চালান।

ঘটনাস্থলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন

মেসের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে সকালে ঘটনাস্থলে ছুটে যান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক তারেক বিন আতিক বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান, মমতাজকে র‌্যাবের গাড়িতে তোলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে নিয়ে যেতে নিষেধ করা হয়।

র‌্যাবের স্টিকারযুক্ত গাড়িতে জবির প্রাক্তন নারী শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা…

তারেক বিন আতিক বলেন, ‘‘শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলে প্রক্টর অফিস ও উপাচার্যকে জানিয়ে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

তিনি জানান, ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিদের কাছে পরিচয়পত্র ও মুঠোফোন নম্বর চাওয়া হলেও তাঁরা তা দিতে রাজি হননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির বলেন, খবর পাওয়ার পর দ্রুত তাঁরা ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে র‌্যাবের গাড়িতে দেখতে পান।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইন অনুযায়ী তদন্ত করা হবে। পাশাপাশি তাঁকে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না কিংবা ঘটনার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

পরে আসে পোশাকধারী র‌্যাব সদস্যরা

জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সকালে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফোন পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। পরে সূত্রাপুর থানার পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং প্রক্টরিয়াল টিম সেখানে উপস্থিত হন।

তিনি বলেন, প্রথমে সাদাপোশাকে আসা ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। পরে পোশাকধারী র‌্যাব সদস্যরাও ঘটনাস্থলে আসেন। শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত মমতাজকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ বলছে, তাঁরা র‌্যাব-২-এর সদস্য

ঘটনার বিষয়ে সূত্রাপুর থানার ওসি মোহাম্মদ আনোয়ার বলেন, মেসে যাওয়া ব্যক্তিরা মোহাম্মদপুরের র‌্যাব-২-এর সদস্য ছিলেন।

ওসি বলেন, ‘‘তাঁরা একটি মামলার অভিযোগের ভিত্তিতে ওই শিক্ষার্থীকে নিতে এসেছিলেন। পরে আমরা জানতে পারি, বিষয়টি পারিবারিক বিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মামলা। শেষ পর্যন্ত ওই শিক্ষার্থীকে না নিয়ে তাঁরা চলে যান।’’

মামলাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানায় যোগাযোগ করে তথ্য নেওয়া প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

ঘটনার পর মমতাজ আরা বর্ষা নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আইনগত অভিযোগ থাকলে সেটি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তদন্ত ও পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *