জাতীয়

‘বাংলাদেশ আর তাঁবেদার রাষ্ট্র হবে না’: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশকে আর কখনো কোনো দেশের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হতে দেওয়া হবে না। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দেশের ভেতরে কিংবা বাইরে থেকে যত ষড়যন্ত্রই হোক, গণতন্ত্রকামী জনগণকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

‘বাংলাদেশ আর তাঁবেদার রাষ্ট্র হবে না’: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান….

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কেউ যেন দেশের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে, সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। স্বাধীনতা অর্জন যেমন জাতির ঐতিহাসিক গৌরব, তেমনি সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলা প্রতিটি প্রজন্মের দায়িত্ব। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গঠনে এগিয়ে আসতে হবে।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গতকাল শনিবার রাজধানীর বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিকেলে বিএনপির আয়োজিত বর্ণাঢ্য ‘সার্বভৌমত্ব’ শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন তিনি। নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রাটি প্রায় ছয় কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় মন্ত্রিসভার সদস্য, দলের কেন্দ্রীয় নেতা এবং বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী তাঁর সঙ্গে অংশ নেন।

৭ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যের প্রতীক

আর্মি স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ৭ নভেম্বরকে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘ম্যাগনাকার্টা’। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করেছিল।

তিনি বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে, তখনই এ দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তাই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ।’

তিনি আরও বলেন, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ কিংবা সম্প্রদায়ভেদে নয়, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার পরিচয় একটাই—আমরা বাংলাদেশি। এই জাতীয় পরিচয়ই দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার সবচেয়ে বড় শক্তি।

তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান

তরুণদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি জাতির ইতিহাস শুধু অতীতের স্মৃতিচারণের বিষয় নয়। সত্য ইতিহাস একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা জোগায়। যে দেশের তরুণ সমাজ জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ নয়, সে দেশের জাতীয় ঐক্য কখনো শক্তিশালী হতে পারে না।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান—প্রতিটি ঐতিহাসিক পর্বে বাংলাদেশের তরুণরা দেশের স্বার্থে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীনতার প্রশ্নে তারা কখনো আপস করেনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতের গৌরব ও সংগ্রামের ইতিহাস ধারণ করেই নতুন প্রজন্মকে একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

‘ষড়যন্ত্রের জবাব ঐক্যবদ্ধভাবেই দেওয়া হবে’

বিকেলে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শোভাযাত্রার আগে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন।

তিনি অভিযোগ করেন, অতীতের মতো এখনো দেশি-বিদেশি নানা মহল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। আবারও দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করার এবং বিতর্কিত নির্বাচনী ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একাত্তরের মতো, নব্বইয়ের মতো, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো আবারও দাঁতভাঙা জবাব আমরা দিতে চাই। আজকের এই ৭ নভেম্বর হোক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার পূরণের দিন।’

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের মানুষ জীবন ও ত্যাগের বিনিময়ে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, সেই গণতন্ত্র রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী জানতে চান, তাঁরা তাঁর সঙ্গে আছেন কি না। জবাবে উপস্থিত জনতা করতালি ও স্লোগানের মাধ্যমে সমর্থন জানান।

দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, দেশের ভেতরে কিংবা বাইরে থেকে যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় গণতন্ত্রকামী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কোনো ষড়যন্ত্রই এ দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।

তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের বাকস্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। দেশের মানুষের সম্মিলিত শক্তিই সব অপশক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা

এদিকে গ্রাম পুলিশের সদস্যদের জন্য বেতন-ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রাজধানীর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মহাসমাবেশে তিনি এ ঘোষণা দেন।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একজন গ্রাম পুলিশ সদস্য মাসিক ১০ হাজার ৫০০ টাকা এবং একজন গ্রাম পুলিশ প্রধান ১১ হাজার টাকা বেতন পাবেন। পাশাপাশি প্রত্যেক গ্রাম পুলিশ সদস্যকে প্রতি মাসে ১৫০ টাকা করে মোবাইল বিল দেবে সরকার। প্রধানমন্ত্রী জানান, ঘোষিত সিদ্ধান্ত গতকাল থেকেই কার্যকর হবে।

দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা গ্রাম পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

মহাসমাবেশে সারা দেশ থেকে প্রায় ৪১ হাজার গ্রাম পুলিশ সদস্য অংশ নেন। অনুষ্ঠানে দেশের আট বিভাগের আটজন সেরা গ্রাম পুলিশ সদস্যকে সম্মাননা স্মারক ও অর্থ পুরস্কার প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা।

বর্ণাঢ্য প্রদর্শনীতে মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় ইতিহাস

এর আগে সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), রোভার স্কাউট ও বাংলাদেশ স্কাউটের সদস্যরা এতে অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান গ্যালারিতে বসে প্রদর্শনী উপভোগ করেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এবং সশস্ত্র বাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে হাজারো কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণী অংশ নেয়।

প্রদর্শনীতে মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামল এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা তুলে ধরা হয়।

‘একসঙ্গে গড়ব, সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে বিশেষ প্রদর্শনীর সমাপ্তি ঘটে।

দিনব্যাপী এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্র রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।