উদ্দেশ্য ভালো হলেও ক্ষমতার দাপট ও বাড়াবাড়ি অগ্রহণযোগ্য
- মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে অংশ নেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে নানা বিশ্লেষণ। আলোচনায় উঠে আসছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—উদ্দেশ্য মহৎ হলেও ক্ষমতার অপব্যবহার, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা সীমা অতিক্রম করার কোনো সুযোগ নেই।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে গত সোমবার দুপুরে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। এরপর মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা, দোকানপাট ও আড্ডায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকে। অনেকের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্বের অংশ। তবে সেই অবস্থান বাস্তবায়নের পদ্ধতিও হতে হবে আইনসম্মত ও দায়িত্বশীল।ঢাকা-৬ আসনের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজ এলাকায় মাদকবিরোধী ভূমিকার জন্য ইশরাক হোসেনের প্রতি অনেকের সমর্থন রয়েছে। কিন্তু অভিযানের সময় আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে দলবল নিয়ে তার অংশগ্রহণের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, একজন জনপ্রতিনিধি কিংবা সরকারের দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তি এভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করতে পারেন না। এতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা প্রকাশ পায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা ও কর্তৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও বিষয়টি নিয়ে একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। গতকাল নিজ নির্বাচনি এলাকায় তিনি বলেন, মাদক নির্মূলে ইশরাকের উদ্দেশ্য ভালো ছিল। তবে এভাবে অস্ত্র হাতে নেওয়া শোভন নয়। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করতে বলেছেন এবং তিনি পদত্যাগ করেছেন।ইশরাকের পদত্যাগ ঘিরে আলোচনায় তার অতীত রাজনৈতিক ভূমিকার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশে সক্রিয় অংশগ্রহণ, একাধিকবার কারাবরণ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর কাছে তিনি সাহসী ও কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবে পরিচিত। অন্যায়ের প্রতিবাদে তার দৃঢ় অবস্থানের কথাও স্মরণ করছেন অনেকে।একই সঙ্গে আলোচনায় আসছে তার প্রয়াত বাবা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বিষয়টি। প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ৩৯ বছর বয়সি ইশরাককে ঘিরে ঢাকাবাসীর প্রত্যাশাও কম নয়। তবে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কিংবা রাজনৈতিক অতীতের কারণে বর্তমান দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অনিয়ম বা বাড়াবাড়িকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায় না—এমন মতও দিয়েছেন অনেকে।রাজধানীর মালিবাগে একটি কফির দোকানে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিলেন বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা নূরুজ্জামান, গার্মেন্টস ব্যবসায়ী অপু এবং বেসরকারি চাকরিজীবী নাজমুল। তাদের আলোচনায় উঠে আসে, ইশরাকের পদত্যাগকে কেবল একজন তরুণ প্রতিমন্ত্রীর বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং ক্ষমতাসীন দলের নেতা, মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধিদের আচরণের সীমা কোথায়—সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে।তাদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে প্রত্যাশা বেড়েছে। জনগণ এখন দেখতে চায়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাজনৈতিক নেতারা আগের মতো শক্তি প্রদর্শন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে কতটা বেরিয়ে আসতে পারেন। শুধু ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই হবে না; সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াতেও আইন, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।ইশরাকের ঘটনা সামনে আসতেই আলোচনায় ফিরে এসেছে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের বিষয়টিও। গত ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাকে সংসদ সদস্যের পদ ছাড়তে হয়। রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় তার নাম আলোচনায় আসার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসের মাথায় তাকে পদত্যাগ করতে হয়। দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সংরক্ষিত নারী আসনের কোনো সদস্যের পদত্যাগের ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।ইশরাক ও মিষ্টির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর অবস্থানকে অনেক বিশ্লেষক ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এর মধ্য দিয়ে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল একটি বার্তা দিতে চেয়েছে—মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা দলের সাধারণ নেতা, কেউই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ালে দায়মুক্তি পাবেন না।সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হামলা, ভাঙচুর, অবৈধ দখল কিংবা দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে এই অবস্থান অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা জানিয়েছেন অনেকে। একই সঙ্গে তাদের বক্তব্য, শুধু দলীয় সিদ্ধান্ত বা পদত্যাগের মধ্যেই জবাবদিহি সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।সব মিলিয়ে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘটনা রাজনীতিতে দায়িত্ববোধ, ক্ষমতার সীমা এবং আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। মাদক নির্মূলের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্যোগ অবশ্যই সমর্থনযোগ্য। কিন্তু সেই উদ্যোগের নামে অস্ত্র প্রদর্শন, ক্ষমতার দাপট কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জনপ্রতিনিধিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি তাই স্পষ্ট—জনগণের আস্থা অর্জনের পথ ক্ষমতা প্রদর্শনে নয়, বরং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, দায়িত্বশীল আচরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত।
