ঢাকা–রিয়াদ ফ্লাইট বাতিলে চরম ভোগান্তিতে প্রবাসী কর্মীরা, বাড়ছে চাকরি হারানোর শঙ্কা
- সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির জেরে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মীরা। ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন হাজারো যাত্রী। নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবে পৌঁছাতে না পারলে ভিসা ও আকামার মেয়াদ শেষ হওয়া, চাকরি হারানো এবং আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে তাঁদের মধ্যে।পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক যাত্রীকে বিকল্প রুটে সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করতে হচ্ছে। এতে কারও কারও অতিরিক্ত হাজার হাজার টাকা খরচ হচ্ছে, আবার কেউ জানেন না কবে নাগাদ কর্মস্থলে ফিরতে পারবেন।বিমানবন্দরে অপেক্ষা, অনিশ্চয়তায় যাত্রীরারোববার বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রিয়াদগামী ১০ জনের বেশি যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে তাঁদের দুর্ভোগের চিত্র উঠে আসে। হাতে টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এয়ারলাইনসের কাউন্টারে ঘুরছিলেন অনেকে। কেউ পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন, কেউ লাগেজ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, আবার কেউ বিকল্প ফ্লাইটের খোঁজে ছোটাছুটি করছিলেন।দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের মালেক তাঁদেরই একজন। এক মাসের ছুটি কাটিয়ে সৌদি আরবে ফেরার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু প্রথম টিকিট বাতিল হওয়ায় এখন দুবাই হয়ে মদিনা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। এতে অতিরিক্ত ৮০ হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে।মালেক বলেন, “ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে প্রথম টিকিট বাতিল হয়েছে। এখন বিকল্প পথে যেতে হচ্ছে। বাড়তি ৮০ হাজার টাকা দিয়ে হলেও যেতে চাই। কারণ, কাজে ফিরতে না পারলে আমার বড় বিপদ হবে।”কুমিল্লার চান্দিনার মো. শরীফ সরকারের দুশ্চিন্তার কারণ আকামার মেয়াদ। তিন মাসের ছুটি কাটিয়ে সৌদি আরবে ফেরার কথা ছিল তাঁর। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে আর কাজে ফিরতে পারবেন না—এমন আশঙ্কা থেকেই দ্রুত যাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন, সকাল ১১টার রিয়াদ–দাম্মাম ফ্লাইটটি বাতিল হয়েছে।পরে তাঁকে জানানো হয়, রাত সাড়ে ৮টার ফ্লাইটে মদিনা হয়ে দাম্মামে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। তবু নিশ্চয়তা না থাকায় হতাশ শরীফ বলেন, “যাইতে পারি কি না, আল্লাহ জানেন।”ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক বাবানাটোরের বড়াইগ্রামের আতিকুল ইসলাম প্রথমবারের মতো চাকরি নিয়ে সৌদি আরব যাচ্ছেন। গত ১২ অক্টোবর বিমানবন্দরে এসে প্রথমবার ফ্লাইট বাতিলের খবর পান। রোববার দ্বিতীয়বার এসে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন তিনি।শেষ পর্যন্ত বাবাকে লাগেজসহ বিমানবন্দরে রেখে গুলশান-২-এ গালফ এয়ারের কার্যালয়ে ছুটে যান আতিকুল। তাঁর বাবা আদম আলী একজন কৃষক। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে নিজের সর্বস্ব বিনিয়োগ করেছেন তিনি।আদম আলী বলেন, “আমি কৃষক মানুষ। অনেক আশা নিয়ে আমার সর্বস্ব দিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠাচ্ছি। যদি যেতে না পারে, আমার ছেলের আকামা থাকবে না। আমার মুখের ভাষা বন্ধ হয়ে যাবে।”প্রায় দুই ঘণ্টা পর ফিরে এসে আতিকুল জানান, রাত ৮টায় তাঁর ফ্লাইট নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে তাঁকে বিকল্প রুটে যেতে হবে।একই ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কুমিল্লার বামনপাড়ার মো. আসাদ। সৌদি এয়ারলাইনসে রাত ১১টার ফ্লাইটে যাওয়ার কথা থাকলেও সেটি বাতিল হয়েছে কি না, তা তিনি আগে থেকে জানতে পারেননি।আসাদ বলেন, “আমি জানিই না আমার ফ্লাইট ক্যানসেল হয়েছে। যদি যেতে না পারি, তাহলে আমার সব ছারখার হয়ে যাবে।”ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মো. মাইনুদ্দীনেরও রাত ১টা ৪০ মিনিটে সরাসরি সৌদি এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে যাওয়ার কথা ছিল। পরে তাঁকে জানানো হয়, দুবাই হয়ে মদিনা যেতে হবে। অতিরিক্ত ভাড়া না লাগলেও বিকল্প পথে যাত্রা নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন তিনি।কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে বাড়ছে চাকরি হারানোর ভয়নোয়াখালী থেকে ঢাকায় এসেছিলেন সৌদি আরবের রিয়াদপ্রবাসী আব্দুল মান্নান। চার মাস দেশে ছুটি কাটিয়ে রোববার দুপুরে কর্মস্থলে ফেরার কথা ছিল তাঁর। আগেই টিকিট কেটে যাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন, তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।আব্দুল মান্নান বলেন, “নোয়াখালী থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এখন হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। কবে যেতে পারব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। সৌদি আরবে আমার জরুরি কাজ আছে। নির্ধারিত সময়ে ফিরতে না পারলে ভয়াবহ সমস্যায় পড়তে হবে।”ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে যাত্রীদের ভোগান্তি কিছুটা কমত বলেও মনে করেন তিনি।মালেক, শরীফ, আসাদ ও আব্দুল মান্নানের মতো হাজারো প্রবাসীর যাত্রা আটকে যাওয়ায় তাঁদের পরিবারও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে চাকরি, ভিসা ও আকামার বৈধতা নিয়ে যে সংকট তৈরি হতে পারে, তা তাঁদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।১১৮টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত, ভোগান্তিতে ১৮ হাজারের বেশি যাত্রীবেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী ১১৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৮ হাজার ৩৬২ জন যাত্রী।বাতিল বা স্থগিত ফ্লাইটের মধ্যে ৫২টি সরাসরি এবং ৬৬টি ট্রানজিট ফ্লাইট। ফলে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীদের পাশাপাশি অন্যান্য যাত্রীও বিপাকে পড়েছেন।বিকল্প রুটে যাত্রার চাপ বাড়ায় টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে আগে থেকেই আর্থিক চাপে থাকা কর্মীদের জন্য সৌদি আরবে ফিরে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠছে।বেবিচকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) কাওছার মাহমুদ বলেন, “এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ফ্লাইট বাতিলের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।”বিকল্প ফ্লাইটে যাত্রী পাঠানোর উদ্যোগযাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরবের দাম্মাম ও মদিনাগামী ফ্লাইটে যাত্রীদের পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।গত সোমবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, আসন খালি থাকা সাপেক্ষে যাত্রীদের বিনা অতিরিক্ত খরচে অন্য ফ্লাইটে সমন্বয় করা হবে। যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের অগ্রাধিকার দিয়ে বিকল্প ফ্লাইটে পাঠানোর চেষ্টা চলছে।তবে বিকল্প ব্যবস্থার আওতায় কতজন যাত্রী যেতে পারবেন, তা আসন খালি থাকা এবং সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।কমেছে বিদেশগামী কর্মীর ছাড়পত্রবাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬ জন কর্মী। চলতি বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৩২ জনে। অর্থাৎ এক বছরে ছাড়পত্র নেওয়া কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ।শুধু সৌদি আরবগামী কর্মীদের ক্ষেত্রে এই পতন আরও বেশি। গত বছরের একই সময়ে সৌদি আরবে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ৫ লাখ ৭২ হাজার ৫৪ জন। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে হয়েছে ৩ লাখ ১১ হাজার ৫৬৭ জন। এ ক্ষেত্রে কমেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।রেমিট্যান্সে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সৌদি আরবেরবাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস সৌদি আরবের প্রবাসী কর্মীরা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছয় লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবে গেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে দেশটি থেকে ৫৮৫ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি।এমন পরিস্থিতিতে ফ্লাইট চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন তৈরি হলে প্রবাসী কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তাও চাপে পড়তে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রেও কর্মীদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত গুরুত্বপূর্ণ।বর্তমানে প্রবাসী কর্মীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—কবে স্বাভাবিক হবে ফ্লাইট চলাচল, কখন তাঁরা কর্মস্থলে ফিরতে পারবেন এবং নির্ধারিত সময়ে ফিরতে না পারার কারণে চাকরি বা আকামা নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়বেন কি না। দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং কার্যকর বিকল্প যাত্রাব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে তাঁদের ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
