পুলিশ ইউনিফরমে ফের পরিবর্তনের ভাবনা
পুলিশ বাহিনীর চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের নভেম্বরে ইউনিফরম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লৌহ রঙের নতুন পোশাক প্রবর্তন করা হয় এবং ১৪ নভেম্বর থেকে মহানগর পুলিশ সদস্যরা নতুন ইউনিফরম পরে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পরে পর্যায়ক্রমে জেলা পুলিশও একই পোশাক গ্রহণ করে। তবে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও স্পেশাল প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন (এসপিবিএন)-এর আগের ইউনিফরম বহাল রাখা হয়।
কিন্তু নতুন এ পোশাক চালুর পর থেকেই বাহিনীর ভেতরে ও বাইরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, নতুন রঙের ইউনিফরমের সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পোশাকের যথেষ্ট মিল রয়েছে। এমনকি অনেক বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তারক্ষীদের পোশাকের সঙ্গেও সাদৃশ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। বিষয়টি ইতোমধ্যে সরকারের দায়িত্বশীল মহলের নজরে এসেছে এবং ইউনিফরমে আবারও পরিবর্তন আনার চিন্তাভাবনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ ইউনিফরমে ফের পরিবর্তনের ভাবনা………
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠার পর পুলিশ বাহিনী তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। তখন থেকেই বাহিনীর সংস্কার ও ইউনিফরম পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়। পরবর্তীতে নতুন পোশাক নির্ধারণে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয় এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতেই নতুন রঙ অনুমোদন দেওয়া হয়।
১১ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছিলেন, শুধু পোশাক নয়—সদস্যদের মন-মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি জানান, পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও আনসার বাহিনীর ইউনিফরম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকেই সতর্ক করে বলেছেন, কেবল পোশাক বদলালেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। পুলিশের আচরণ ও পেশাগত মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন না এলে ইউনিফরম পরিবর্তন কার্যকর হবে না—এমন মত তাদের। অতীতেও একাধিকবার পুলিশের পোশাক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত আচরণগত পরিবর্তন আসেনি বলেও তারা উল্লেখ করেন।
সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা গণমাধ্যমকে বলেন, ইউনিফরম পরিবর্তন পরিস্থিতিগতভাবে প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা কমাতে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে মানসিকতা ও পেশাদারিত্বে সংস্কার জরুরি।
মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যেও নতুন পোশাক নিয়ে আপত্তি রয়েছে। ঢাকায় দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন সার্জেন্ট জানান, রাতে ডিউটির সময় নতুন ইউনিফরম দূর থেকে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয় না। আলো পড়লে রঙের ভিন্নতা তৈরি হয়, যা নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার দিক থেকে সমস্যা তৈরি করতে পারে। আগের পোশাক তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান ছিল বলেও তারা মত দেন।
অতিরিক্ত আইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নতুন ইউনিফরম পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে জানানো হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান ইউনিফরম বাহিনীর ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারছে না। তাই নতুন করে চিন্তাভাবনা করা সময়ের দাবি।
সব মিলিয়ে ইউনিফরম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে পুলিশ বাহিনীতে যেমন প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি আছে সংশয়ও। এখন দেখার বিষয়—সরকার কেবল পোশাকেই পরিবর্তন আনে, নাকি আচরণ ও পেশাদারিত্বেও দৃশ্যমান সংস্কার নিশ্চিত করতে পারে।
