Uncategorized

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, বেতন-ভাতা ও কী কী সুবিধা পান

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি। তবে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও সরকারপ্রধান নন। সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।

রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহের বড় একটি বিষয় হলো—এই পদে থাকা ব্যক্তি কতটা সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কী ধরনের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পান।

মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা

রাষ্ট্রপতির বেতন ও সুযোগ-সুবিধা ‘দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্ট’-এর আওতায় নির্ধারিত। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই বেতন আয়করমুক্ত। ২০১৬ সালে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির বেতন বাড়ানো হয়। এর আগে মাসিক বেতন ছিল ৬১ হাজার ২০০ টাকা।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, বেতন-ভাতা ও কী কী সুবিধা পান………..

বেতনের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির আপ্যায়ন বা এন্টারটেইনমেন্টের জন্য বার্ষিক ভাতার ব্যবস্থাও রয়েছে।

বঙ্গভবন সরকারি বাসভবন

রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন। বাসভবনের সাজসজ্জা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়।

সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রপতি গাড়ি ও প্রয়োজনীয় পরিবহন সুবিধা পান। বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ভাতা পাওয়ার বিধান রয়েছে।

বছরে ২ কোটি টাকার স্বেচ্ছাধীন তহবিল

রাষ্ট্রপতির জন্য রয়েছে একটি স্বেচ্ছাধীন তহবিল। এতে বছরে ২ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে। রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় ব্যক্তি বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই অর্থ ব্যবহার করা যায়।

রাষ্ট্রপতি ও পরিবারের বিনামূল্যে চিকিৎসা

রাষ্ট্রপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্যও বিশেষ সুবিধা রয়েছে। দেশের যেকোনো হাসপাতালে তারা বিনা খরচে চিকিৎসা নিতে পারেন।

চিকিৎসকের পরামর্শে বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সেই ব্যয়ও সরকার বহন করে।

বিমানভ্রমণে বছরে ২৭ লাখ টাকা

রাষ্ট্রপতির বিমানভ্রমণের জন্য বছরে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত বিশেষ সুবিধা রয়েছে। ২০১৬ সালের আগে এই সুবিধার পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ টাকা।

অর্থাৎ, মাসিক বেতনের বাইরে রাষ্ট্রপতির জন্য সরকারি বাসভবন, গাড়ি ও পরিবহন, চিকিৎসা, বিদেশ সফরের ভাতা, আপ্যায়ন এবং বিমানভ্রমণসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধা নির্ধারিত রয়েছে।

রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা কতটা?

রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা বুঝতে হলে বাংলাদেশের সংসদীয় সরকারব্যবস্থার বিষয়টি আগে মনে রাখতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার হাতে।

সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দুটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে বাধ্য নন—প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, বেতন-ভাতা ও কী কী সুবিধা পান…

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সাধারণত সেই দলের সংসদীয় দলের নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। তবে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখেন। রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য পাঠাতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করেন।

তবে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া কোনো পরামর্শের বিষয়ে আদালতে তদন্ত করার সুযোগ নেই।

দণ্ড মওকুফের ক্ষমতা

রাষ্ট্রপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা হলো দণ্ড মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করা।

সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া দণ্ড রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করতে পারেন।

সাংবিধানিক দায়মুক্তি

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও সংবিধান বিশেষ দায়মুক্তি দিয়েছে। কার্যকাল চলাকালে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা করা যায় না। তাঁকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালত থেকেও পরোয়ানা জারি করা যায় না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণভাবে জবাবদিহির বাইরে। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাঁকে অভিশংসন করা যায়। শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণেও তাঁকে অপসারণের সাংবিধানিক বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, বেতন-ভাতা ও কী কী সুবিধা পান..

অভিশংসনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষরযুক্ত অভিযোগ স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয় এবং রাষ্ট্রপতিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হয়। এরপর সংসদের মোট সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাস হলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ঘটনা। ২০০২ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি পদত্যাগ করেন।

রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকতে পারেন।

একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে আবদুল হামিদ পরপর দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, বেতন-ভাতা ও কী কী সুবিধা পান……

রাষ্ট্রপতি একই সঙ্গে সংসদ সদস্য থাকতে পারেন না। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যায়।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা

রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তির বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হয় এবং তাঁকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। তবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য আগে সংসদ সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

এ ছাড়া আগে অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পুনরায় রাষ্ট্রপতি হতে পারেন না।

রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান নন

সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির মূল ভূমিকা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা। সংসদে কোনো দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে।

তবে কোনো নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না এলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধানের পদটির সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও সুবিধা

সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রপতির পদ মর্যাদা ও সাংবিধানিক গুরুত্বের দিক থেকে দেশের সর্বোচ্চ পদ হলেও সংসদীয় ব্যবস্থায় তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত।

প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, দণ্ড মওকুফসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। তবে সরকারের দৈনন্দিন ও কার্যকর নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, বেতন-ভাতা ও কী কী সুবিধা পান….

অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির জন্য রয়েছে উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা—মাসিক বেতন, সরকারি বাসভবন, গাড়ি ও পরিবহন, চিকিৎসা, বিদেশ সফরের ভাতা, আপ্যায়ন, বিমানভ্রমণ এবং স্বেচ্ছাধীন তহবিলসহ বিভিন্ন সুবিধা।

ফলে রাষ্ট্রপতির পদটি একদিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক মর্যাদার প্রতীক, অন্যদিকে সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ও দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *