বাংলাদেশ

হাম-ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

হাম ও ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, এসব রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষ—সবাইকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ করতে হবে।

শনিবার দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

হাম-ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী……

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সংক্রামক রোগের বিস্তার ঠেকাতে একটি সরকারকে সবসময় প্রস্তুত ও সতর্ক থাকতে হয়। তাঁর দাবি, ২০২০ সালের ২০ ডিসেম্বরের পর প্রতি চার বছর অন্তর ব্যাপক পরিসরে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার প্রয়োজন থাকলেও ২০২০ সালের পর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এ কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।

তিনি বলেন, টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইউনিসেফের ডেলিগেটেড পদ্ধতিতে সরাসরি কেনাকাটার পরিবর্তে আগের সরকার ওপেন টেন্ডারে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। এ বিষয়ে বিদেশি সংস্থাগুলো একাধিকবার অনুরোধ জানালেও তা কার্যকর হয়নি। ফলে টিকা সংগ্রহে সময়ক্ষেপণ হয় এবং দীর্ঘ সময়ের একটি ঘাটতি তৈরি হয়।

হাম-ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী….

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর বর্তমান সরকারকে সেই ঘাটতির প্রভাব মোকাবিলা করতে হয়েছে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে অসংখ্য পরিবারকে কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এবং অনেক মা তাদের সন্তান হারিয়েছেন।

তিনি জানান, দেশে ১ কোটি ৮৫ লাখ ৮৩৩ জন রোগীর মধ্যে প্রায় এক হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একটি শিশুর মৃত্যুও অত্যন্ত বেদনাদায়ক উল্লেখ করে তিনি বলেন, সন্তানের মৃত্যু একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুকে টিকা

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর ৫ এপ্রিল থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়। প্রথম ধাপে ইউনিসেফের নির্ধারিত তিনটি পর্যায়ে ১৮টি জেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে ঢাকা ও আরও দুটি বড় সিটি করপোরেশনকে কর্মসূচির আওতায় আনা হয়।

হাম-ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী……

পরবর্তী ধাপে ৪ মে থেকে সারাদেশে কর্মসূচি শুরুর কথা থাকলেও তা এগিয়ে এনে ২০ এপ্রিল থেকেই দেশব্যাপী টিকাদান শুরু করা হয়। ওই কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

হাম আক্রান্ত শিশুদের অপুষ্টি নিয়ে উদ্বেগ

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশের মধ্যে পুষ্টির ঘাটতি দেখা গেছে। চিকিৎসকদের মতে, হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া এবং এর সঙ্গে থাকা অপুষ্টি।

হাম-ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী……

অপুষ্টিতে ভোগা শিশু হাম আক্রান্ত হলে দ্রুত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। গুরুতর অবস্থায় তাদের ফুসফুসে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে।

এ পরিস্থিতিতে আইসিডিডিআরবির চিকিৎসক চিশতি মাত্র ১৫০ টাকা খরচে বোতলভিত্তিক একটি সিপ্যাপ ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেছেন বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। স্বাভাবিকভাবে অক্সিজেন নিতে না পারা শিশুদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে অনেক শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি

বাংলাদেশের ঘনবসতির কারণে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত শিশুর কাছাকাছি থাকা অন্য শিশুরাও সহজেই সংক্রমিত হতে পারে।

একই বিছানায় একাধিক শিশুর থাকা কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি চলাফেরার মাধ্যমেও সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে বলে জানান তিনি।

বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে টিকা

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ভিটামিন এ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে ২ কোটি ২৫ লাখ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে টিকা পেয়েছিল ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশু। দুই কর্মসূচির মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ শিশুর ব্যবধানের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা হয়।

এরপর বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আগের ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পরের দিন থেকে ঈদুল আজহার পরের দিন পর্যন্ত প্রায় ১৪ লাখ শিশুকে শনাক্ত করে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে এরপরও হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় নতুন করে ক্যাচআপ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ইউনিসেফ ১০ দিনের মধ্যে আরও ৪০ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহ করেছে। আগের মজুতের সঙ্গে নতুন টিকা মিলিয়ে এবার ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ নতুন জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২৪ লাখ আগে বাদ পড়া শিশু রয়েছে।

ইউনিয়ন পর্যায়েও জোরদার কার্যক্রম

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, নতুন কর্মসূচির আওতায় সারাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় প্রশাসন, সিভিল সার্জন, ইউএনও ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে আগের চেয়ে আরও জোরদারভাবে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

কর্মসূচি সফল করতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

কর্মজীবী মায়েদের কথা বিবেচনায় নিয়ে ছুটির দিনেও টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে সন্ধ্যার পরও টিকাদান কার্যক্রম চলবে। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে এই ক্যাম্পেইনের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি আরও জানান, বর্তমান কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও প্রায় ১০ লাখ ডোজ টিকা মজুত থাকবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় ৪৩ লাখ ডোজ টিকা বিতরণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মপআপ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার জন্যও টিকা সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাম ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; অভিভাবক, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যমসহ সমাজের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *