Tuesday, April 28, 2026
Latest:
Uncategorized

দেশজুড়ে হামের উচ্চঝুঁকি: দেড় মাসে ২৬৪ শিশুর মৃত্যু, প্রস্তুতিতে ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ

দেশজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হাম। ইতোমধ্যে ৬১টি জেলায় বিস্তার ঘটেছে এই রোগের, আর গত দেড় মাসেই প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ২৬৪ শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি এখন ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’—যা কার্যত মহামারির পর্যায়ে পৌঁছানোর ইঙ্গিত দেয়। অথচ প্রয়োজনীয় জরুরি পদক্ষেপ নিতে এখনো দৃশ্যমান কোনো শক্তিশালী উদ্যোগ নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে ৩৩ হাজারের বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে এবং প্রায় ২২ হাজার শিশু ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে প্রায় ৩ হাজার শিশু।

দেশজুড়ে হামের উচ্চঝুঁকি: দেড় মাসে ২৬৪ শিশুর মৃত্যু, প্রস্তুতিতে ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ………..

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশের এই পরিস্থিতিকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে টিকার ঘাটতি ও বাড়তে থাকা মৃত্যুহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অবস্থায় দ্রুত জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করা উচিত ছিল, যাতে সমন্বিতভাবে প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কার্যক্রম জোরদার করা যায়।

প্রস্তুতিতে ঘাটতি, বাড়ছে জটিলতা

বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, মহামারি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় মৌলিক পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো কোনো একীভূত চিকিৎসা প্রটোকল তৈরি করা হয়নি, স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি, এমনকি রোগ শনাক্তে পর্যাপ্ত পরীক্ষাও করা যাচ্ছে না কিটস্বল্পতার কারণে।

বর্তমানে কেবল রাজধানীর একটি ল্যাবেই হামের পরীক্ষা সীমিত আকারে করা হচ্ছে। প্রতিদিন যেখানে কয়েকশ নমুনা পরীক্ষা করার সক্ষমতা রয়েছে, সেখানে কিটের অভাবে অনেক কম পরীক্ষা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত সংক্রমণের চিত্র পুরোপুরি জানা যাচ্ছে না।

সংক্রমণ দ্রুত ছড়ানোর কারণ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরের শুরু থেকেই হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। এর মধ্যে জাতীয় নির্বাচন ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মানুষের ব্যাপক যাতায়াত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার বড় কারণ। হাম এমন একটি রোগ, যেখানে আক্রান্ত একজন শিশু খুব অল্প সময়েই অনেকের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

মৃত্যুর পেছনে বড় কারণগুলো

মৃত্যুবরণ করা শিশুদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেকেই হাসপাতালে আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মারা গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুরা গুরুতর নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং অন্যান্য জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে এসেছে। অপুষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী রোগও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

চিকিৎসকদের মতে, দেশে আগে থেকেই শিশুদের নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যুর হার ছিল, কিন্তু তা কমাতে বড় কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি, গুরুতর রোগীদের সেবা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামোও অনেক ক্ষেত্রে নেই।

টিকাদানেও চ্যালেঞ্জ

যদিও বাংলাদেশ অতীতে হাম প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে দুর্বল করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকা আমদানি করলেই হবে না—সঠিক সংরক্ষণ, বিতরণ এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর পরিকল্পনা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের মতে, এখনই যা করা জরুরি:

  • জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা
  • দ্রুত রোগ শনাক্ত ও আইসোলেশন ব্যবস্থা
  • পর্যাপ্ত পরীক্ষা ও নজরদারি জোরদার
  • স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ
  • হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করা
  • টিকা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে সচেতনতা বৃদ্ধি

চিকিৎসকদের সংগঠনগুলোরও দাবি, পরিস্থিতিকে ‘মহামারি’ হিসেবে স্বীকার করে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে শিশুমৃত্যুর হার আরও বাড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *