ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধনীতি নিয়ে এবার প্রকাশ্য বিরোধিতায় নেমেছেন তার নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজন প্রভাবশালী সিনেটর। প্রেসিডেন্টের একক সামরিক ক্ষমতা সীমিত করতে মার্কিন সিনেটে পাস হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন চার রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা। বিষয়টিকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বিরল রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
মঙ্গলবার মার্কিন সিনেটে ৫০-৪৭ ভোটে পাস হওয়া এই প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো ‘ওয়ার পাওয়ার অ্যাক্ট’-এর আওতায় প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতার ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা। প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পল, সুসান কলিন্স, লিসা মুরকাওস্কি এবং বিল ক্যাসিডি। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান নিজ দলের অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে ভোট দেন। ভোটাভুটির সময় তিন রিপাবলিকান সিনেটর অনুপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘ ৮১ দিন ধরে চলা ইরান-সংকটকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই বিতর্ক বাড়ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংঘাতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো, বন্ধ হয়ে গেছে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রুট হরমুজ প্রণালি। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে।
ডেমোক্র্যাটদের দাবি, মার্কিন আইন অনুযায়ী কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্ট ৬০ দিনের বেশি সময় বিদেশে সামরিক অভিযান চালাতে পারেন না। সেই সময়সীমা গত ১ মে শেষ হয়ে গেছে। তবে হোয়াইট হাউসের যুক্তি, ৮ এপ্রিল ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে ওই সময় গণনা স্থগিত রয়েছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার সাংবিধানিক সুযোগ পাচ্ছে বলে দাবি তাদের।
যদিও সিনেটের এই ভোটের ফলে ট্রাম্পকে তাৎক্ষণিকভাবে সেনা প্রত্যাহার করতে হচ্ছে না, তবু এটি কংগ্রেসের পক্ষ থেকে একটি শক্ত রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে আইনটি পুরোপুরি কার্যকর করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট— উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন, যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, কংগ্রেসের দুই কক্ষেই অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে রিপাবলিকানরা।
এদিকে যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। ইরান ১৪ দফা প্রস্তাব তুলে ধরে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, তেল রফতানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের কর্তৃত্বের স্বীকৃতি দাবি করেছে। জবাবে ওয়াশিংটন তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও, দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে যাচ্ছে। এর মধ্যেই সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর অনুরোধে তিনি একটি পূর্বপরিকল্পিত সামরিক হামলা স্থগিত করেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও বাহরাইনের পক্ষ থেকে চলমান আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতির আশ্বাস পাওয়ার কথাও জানান তিনি। তবে একই সঙ্গে কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দেন— ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না।
