থানায় পড়ে থেকে পচবে না জব্দ করা খাদ্যশস্য, দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ হাইকোর্টের
মজুতদারির অভিযোগে জব্দ করা পচনশীল খাদ্যশস্য দীর্ঘদিন থানায় ফেলে রেখে নষ্ট করার কোনো আইনি সুযোগ নেই বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে পচনশীল ভোগ্যপণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা বছরের পর বছর পুলিশ হেফাজতে রেখে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
থানায় পড়ে থেকে পচবে না জব্দ করা খাদ্যশস্য, দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ হাইকোর্টের….
‘মো. শিবলু হোসেন বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় গত ১৯ আগস্ট বিচারপতি মো. খায়রুল আলম ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। রায়টি লিখেছেন বিচারপতি মো. খায়রুল আলম। রায়ের অনুলিপি মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমের হাতে এসেছে।
এক বছরের বেশি সময় থানায় পড়ে ছিল ২৫ টন চাল
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৩ জুলাই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। এ সময় মো. জাহিদুল ইসলামের বাড়ি থেকে অবৈধভাবে মজুত করা ২৫ হাজার কেজি বা ২৫ মেট্রিক টন কাটারি আতপ চাল উদ্ধার করা হয়। ৫০০ বস্তায় থাকা ওই চালের আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ১৫ লাখ টাকা।
থানায় পড়ে থেকে পচবে না জব্দ করা খাদ্যশস্য, দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ হাইকোর্টের…
পরদিন ৪ জুলাই বদলগাছী থানায় ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহণ, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’-এর ৩(ঘ) ও ৪ ধারায় শিবলু হোসেন ও জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
পরে মামলাটি বিচারের জন্য নওগাঁর তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। তদন্ত চলাকালে শিবলু হোসেন জব্দ করা চালের প্রকৃত মালিক দাবি করে তা তাঁর জিম্মায় দেওয়ার আবেদন করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে শিবলু হোসেনকে জব্দ করা চালের প্রকৃত মালিক হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ওই প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও ২২ জুলাই চালের জিম্মা চেয়ে করা আবেদন খারিজ করে দেন আদালত। পরবর্তী সময়ে ওই আদেশের বিরুদ্ধে করা রিভিশনও খারিজ হয়ে যায়।
থানায় পড়ে থেকে পচবে না জব্দ করা খাদ্যশস্য, দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ হাইকোর্টের..
এরপর ১৩ নভেম্বর শিবলু হোসেন আবারও চালের জিম্মা চেয়ে আবেদন করেন। একই দিন আবেদনটি খারিজ হলে তিনি অধস্তন আদালতের আদেশ বাতিল এবং চাল নিজের জিম্মায় পাওয়ার জন্য হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন করেন।
আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পরে গত ১৯ আগস্ট সেই রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় দেন আদালত।
আলামত হিসেবে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই সংরক্ষণ
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, জব্দ করা চাল দীর্ঘদিন পুলিশ হেফাজতে থাকায় তা নষ্ট হয়ে মানুষের খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এভাবে চাল পুলিশ হেফাজতে রেখে দিলে মামলার কোনো কার্যকর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহণ, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’-এর ১১ ধারার বিধান বিশ্লেষণ করে আদালত বলেন, এই আইনের অধীনে জব্দ করা খাদ্যশস্য পচনশীল কিংবা অপচনশীল—যাই হোক না কেন, আলামত হিসেবে প্রমাণের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, শুধু সেই পরিমাণ নমুনা সংরক্ষণ করতে হবে।
থানায় পড়ে থেকে পচবে না জব্দ করা খাদ্যশস্য, দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ হাইকোর্টের…
বাকি খাদ্যশস্য দ্রুত প্রকাশ্য নিলাম বা আইনসম্মত অন্য কোনো উপায়ে নিষ্পত্তি করতে হবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালত আরও বলেন, আইনের ১১(৩) ধারার বিধান অনুযায়ী, বিচার শেষে অপরাধ প্রমাণিত হলে খাদ্যশস্য বিক্রি করে পাওয়া অর্থ বা জামানত সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে। আর আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত না হলে তা প্রকৃত মালিককে ফেরত দিতে হবে।
১৫ লাখ টাকার বন্ডে চাল ফেরত দেওয়ার নির্দেশ
হাইকোর্ট বলেন, ২০২৫ সালের ৩ জুলাই চাল জব্দ করা হলেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ ছাড়াই তা এক বছরের বেশি সময় থানায় পড়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন এভাবে রাখার ফলে চাল নষ্ট হয়ে মানুষের ভোগের অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ অবস্থায় চালগুলো পুলিশ হেফাজতে রেখে দেওয়ার কোনো কার্যকর উদ্দেশ্য নেই বলে মত দেন আদালত।
রায়ে সংশ্লিষ্ট সেশন আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হয়, জব্দ করা চালের প্রয়োজনীয় পরিমাণ সাক্ষ্যপ্রমাণের জন্য নমুনা হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। অবশিষ্ট চাল আবেদনকারী মো. শিবলু হোসেনের কাছে ১৫ লাখ টাকার বন্ড সম্পাদনের শর্তে হস্তান্তর করতে হবে।
রায়ে বলা হয়, বিচারপ্রক্রিয়া শেষে শিবলু হোসেনের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হলে ১৫ লাখ টাকার বন্ডের অর্থ বাজেয়াপ্ত করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। আর অপরাধ প্রমাণিত না হলে ওই বন্ড বা জামানত বাতিল বলে গণ্য হবে।
রায় ঘোষণার সময় আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী মো. মাহবুবুর রহমান এবং রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মির্জা আল মাহমুদ ও মো. মাসুদুল আলম দোহা শুনানি করেন।
