Wednesday, June 24, 2026
Latest:
Uncategorized

বাংলাদেশ-চীন মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে জোর, বাণিজ্য বৈষম্য কমানোয় গুরুত্ব

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়ার পরও দেশটিতে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বার্ষিক বাণিজ্যের মধ্যে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারই চীনের অনুকূলে, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারেরও কম। এই বাণিজ্য বৈষম্য কমানোই প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

বাংলাদেশ-চীন মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে জোর, বাণিজ্য বৈষম্য কমানোয় গুরুত্ব…………

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সফরকালে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি এবং প্রযুক্তি সহযোগিতাসহ বিভিন্ন খাতে ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হতে পারে। বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পে চীনা অর্থায়নের বিষয়টি।

এফটিএ আলোচনায় নতুন গতি

বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পর চীনের বর্তমান শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত থাকবে না। ফলে দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এফটিএ বিষয়ে দুই দেশের যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে ওই সমীক্ষার ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে।

চীনের বাজারে যাচ্ছে বাংলাদেশি আম ও কাঁঠাল

বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য সফরটি একটি বড় মাইলফলক হতে পারে। চীনে তাজা আম ও কাঁঠাল রপ্তানির লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্প্রতি চীনের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি তাজা আম আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ফাইটোস্যানিটারি অনুমোদন দিয়েছে। সফরকালে এ-সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় প্রটোকল চূড়ান্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, চীনের বিশাল ভোক্তা বাজারে বাংলাদেশের আম ও কাঁঠালের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হলে কৃষি রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন দিগন্ত

বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পণ্য রপ্তানির পাশাপাশি সেবা খাতে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হবে। বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মোংলায় দ্বিতীয় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়েও অগ্রগতি হতে পারে।

ডিজিটাল অর্থনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে একটি বিশেষ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে মুদ্রা লেনদেন সহজ করতে বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংক স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হবে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক এবং চীনের ন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রেগুলেটরি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মধ্যে ব্যাংকিং ও বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হতে পারে।

অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে চীনা সহায়তা

অবকাঠামো উন্নয়নেও সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সংস্কার, চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতুর সংস্কার এবং নবম চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হতে পারে।

এ ছাড়া বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হবে। বাংলাদেশের অবকাঠামো প্রকল্পে সহজ শর্তে অর্থায়নের জন্য চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করারও পরিকল্পনা রয়েছে।

‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড গঠনের উদ্যোগ

বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, চীনের দেওয়া শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা কাজে লাগানোর এখনই উপযুক্ত সময়। তিনি জানান, “মেইড ইন বাংলাদেশ”কে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে চীনের বাজারে প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ।

এ লক্ষ্যে বিসিসিআই চীনের রাষ্ট্রদূতের কাছে কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের বিভিন্ন শহরে ৩০টি বাংলাদেশি পণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে ২০টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংক স্থাপন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক কৌশল ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *