Uncategorized

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে উপচে পড়া ভিড়, সময়সূচি নিয়ে দর্শনার্থীদের বিড়ম্বনা

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে শুক্রবার উপচে পড়া ভিড়, টিকিটের দীর্ঘ সারি ও সময়সূচি পরিবর্তনে দর্শনার্থীদের বিড়ম্বনা। জনবল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে উপচে পড়া ভিড়, সময়সূচি নিয়ে দর্শনার্থীদের বিড়ম্বনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের সামনে ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। সকাল থেকেই পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ জাদুঘর দেখতে আসেন। তবে ছুটির দিনের সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয়টি আগে থেকে স্পষ্টভাবে না জানানোয় অনেকেই পড়েন বিড়ম্বনায়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে জাদুঘরে প্রবেশ করতে পারেননি।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে উপচে পড়া ভিড়, সময়সূচি নিয়ে দর্শনার্থীদের বিড়ম্বনা

গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি, শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী, আলোকচিত্র, নথিপত্র ও ভিডিওচিত্র দেখতে রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। জাদুঘরটি সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর শুক্রবার ছিল প্রথম সাপ্তাহিক ছুটির দিন। অতিরিক্ত দর্শনার্থীর চাপ সামলাতে গিয়ে জাদুঘরের প্রবেশপথে কিছুটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়।

টিকিটের জন্য দীর্ঘ সারি, গরমে দুর্ভোগ

শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে জাদুঘরের মূল প্রবেশফটকে গিয়ে দেখা যায়, টিকিটের জন্য শত শত মানুষ দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করছেন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে অনেককে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে উপচে পড়া ভিড়, সময়সূচি নিয়ে দর্শনার্থীদের বিড়ম্বনা

অপেক্ষমাণ কয়েকজন দর্শনার্থী জানান, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও তারা টিকিট পাচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে উত্তেজিত কয়েকজন জোর করে টিকিট কাউন্টারের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে নিরাপত্তারক্ষীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

রাজধানীর পল্লবী থেকে পরিবার নিয়ে আসা আজাদুল ইসলাম বলেন, ‘বাচ্চা নিয়ে আধা ঘণ্টার বেশি রোদে দাঁড়িয়ে আছি। এখনো টিকিট পাইনি।’

মূল প্রবেশফটকে টিকিট না পেয়ে কেউ কেউ বের হওয়ার গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এতে ওই গেটেও ভিড় তৈরি হয়। জাদুঘরের কর্মীরা তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে কয়েকজনের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয়।

সময়সূচি পরিবর্তনে ক্ষোভ

দর্শনার্থীদের অনেকেই জানান, প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে জাদুঘর খোলা থাকে—এমন ধারণা নিয়েই তারা সেখানে এসেছিলেন। কিন্তু শুক্রবার ছুটির দিনের সময়সূচি অনুযায়ী জাদুঘর বিকেল ৩টা থেকে খোলার কথা জানতে পারেন তারা।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে উপচে পড়া ভিড়, সময়সূচি নিয়ে দর্শনার্থীদের বিড়ম্বনা

হঠাৎ সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয়টি আগে থেকে জানানো হয়নি—এমন অভিযোগ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে ফিরে যান। আবার দূর-দূরান্ত থেকে আসা কয়েকজন জাদুঘর খোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।

রাজধানীর খিলক্ষেত থেকে ছেলেকে নিয়ে আসা আরিফুর ইসলাম বলেন, ছুটির দিনে মানুষ সাধারণত নামাজের পর ঘুরতে বের হয়। বিকেলে ভিড়ও বেশি থাকে। তাই শিশুকে নিয়ে সকাল সকাল এসেছিলেন। এসে দেখেন জাদুঘর বন্ধ। বিকেল ৩টায় খোলার কথা জানতে পেরে অপেক্ষা না করে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

সাভার থেকে ছেলে জিহাদ ও মেয়ে রোমানাকে নিয়ে আসা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক দূর থেকে এসেছি। ফিরে গিয়ে আবার আসার সুযোগ নেই। তাই জাদুঘর খোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করব।’

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে উপচে পড়া ভিড়, সময়সূচি নিয়ে দর্শনার্থীদের বিড়ম্বনা

রিয়াজ নামে এক দর্শনার্থী জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তিনি ঢাকার বাইরে থেকে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। সেই সময় ঢাকায় আসতে না পারায় এবার জুলাই স্মৃতি জাদুঘর দেখতে এসেছেন। তবে এসে জাদুঘর বন্ধ দেখতে পান।

তার অভিযোগ, দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের জাদুঘর কখন খুলবে বা কীভাবে প্রবেশ করতে হবে—এ বিষয়ে তথ্য দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত লোকজন সেখানে ছিলেন না।

রাজশাহী থেকে ঢাকায় ঘুরতে এসে শুধু জাদুঘর দেখতে গিয়েছিলেন আইনাল হক। তিনি বলেন, ‘আবেগের জায়গা থেকেই দেখতে এসেছিলাম। অনেক দূর থেকে জার্নি করে এসেছি। এসে দেখলাম জাদুঘর বন্ধ। শুক্রবার বিকেল ৩টায় খুলবে। এটা আমাদের জন্য অনেক কষ্টকর।’

বিকেল ৩টায় শুরু হয় প্রবেশ

জাদুঘরের দেয়ালে শুক্রবারের পরিবর্তিত সময়সূচি সংবলিত একটি প্রিন্টেড কাগজ টানানো ছিল। কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার জাদুঘর বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকার কথা। তবে দর্শনার্থীদের সর্বশেষ প্রবেশের সময় নির্ধারণ করা হয় বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে উপচে পড়া ভিড়, সময়সূচি নিয়ে দর্শনার্থীদের বিড়ম্বনা

বেলা ৩টার পরপরই টিকিট বিক্রি শুরু হলে দর্শনার্থীরা ধীরে ধীরে জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করেন।

জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আলোকচিত্র, শহীদদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, নথিপত্র, ভিডিওচিত্র এবং আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে।

জনবল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ফারুকীর বিস্ময়

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের জনবল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

শুক্রবার বিকেলে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, পর্যাপ্ত স্টাফ নিয়োগ ও নিরাপত্তা প্রটোকল রিহার্সাল ছাড়াই জাদুঘরটি এভাবে খুলে দেওয়া তাঁর কাছে বিস্ময়কর।

ফারুকী বলেন, জুলাই নিয়ে মানুষের আগ্রহ অনুপ্রেরণার বিষয় হলেও জাদুঘরে শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন এবং গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম রয়েছে। এভাবে দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হলে অনেক কিছু নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন কিছু সামগ্রীও রয়েছে, যা একবার নষ্ট হলে আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নাও হতে পারে।

একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতার বিষয়টিও তুলে ধরে তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে একজন দর্শক জাদুঘরের সঠিক অভিজ্ঞতা কীভাবে পাবেন, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।

জাদুঘরটি সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ফারুকী প্রয়োজনে সাময়িকভাবে জাদুঘর বন্ধ রেখে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রটোকল ঠিক করার পর পুনরায় চালুর পরামর্শ দেন।

প্রবেশমূল্য ৫০ ও ২০ টাকা

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে উপচে পড়া ভিড়, সময়সূচি নিয়ে দর্শনার্থীদের বিড়ম্বনা

এর আগে বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জনসাধারণের জন্য জাদুঘরটি উন্মুক্ত করা হয়। সেদিন দায়িত্বরতরা জানিয়েছিলেন, জাদুঘরের সাপ্তাহিক ছুটির দিন বৃহস্পতিবার।

সাধারণ দিনে দর্শনার্থীরা সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা, দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৩টা এবং বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা—এই সময়পর্বগুলোতে প্রবেশের সুযোগ পাবেন বলে জানানো হয়েছিল।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে প্রবেশের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের টিকিটের মূল্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনলাইনে জাদুঘরের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে টিকিট সংগ্রহের পাশাপাশি সরাসরি জাদুঘর থেকেও টিকিট কেনার সুযোগ রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *