সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন, ভোট শুরু ১২ নভেম্বর
দেশের ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ভোটের মধ্য দিয়ে শুরু হবে ইউপি নির্বাচন। শেষ ধাপের ভোট অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের ২৭ মে।
সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন, ভোট শুরু ১২ নভেম্বর……
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রথম ধাপে ৬৩ জেলার ৮০টি উপজেলার সব ইউনিয়নে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে ভোটের চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণের আগে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃবিভাগীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে তফসিল ঘোষণা করবে কমিশন।
সোমবার নির্বাচন ভবনে ইউপি নির্বাচন নিয়ে কমিশন সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখগুলো হলো—প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ও শেষ ধাপ ২৭ মে।
সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন, ভোট শুরু ১২ নভেম্বর….
নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, বিভিন্ন পরীক্ষা, দুর্গাপূজা, রমজান ও ঈদের সময় বিবেচনায় নিয়েই সাত ধাপে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব বিষয় সমন্বয় করে নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে।
ইউপি নির্বাচনের পর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে।
প্রায় এক দশক পর ইউপি ভোটে বিএনপি
২০২১ ও ২০২২ সালে ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। এর আগে ২০১৬ সালের নির্বাচনে দলটি অংশ নিয়েছিল। ফলে প্রায় এক দশক পর এবার আবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।
তবে নির্বাচনের মাঠে নামার আগেই বিএনপিকে বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই চেয়ারম্যান পদে বিএনপির একাধিক নেতা প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। কোথাও কোথাও সম্ভাব্য প্রার্থীরা এরই মধ্যে জনসংযোগও শুরু করেছেন।
সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন, ভোট শুরু ১২ নভেম্বর…..
দলীয় নেতাদের ধারণা, প্রতিটি ইউনিয়নে গড়ে ৭ থেকে ১৭ জন পর্যন্ত বিএনপির সমর্থনপ্রত্যাশী রয়েছেন। ফলে দলীয়ভাবে একজনকে সমর্থন দেওয়ার পর বাকিদের ওই প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করাই হবে বড় পরীক্ষা।
তফসিল যত এগিয়ে আসছে, বিএনপির সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নিজেদের একাধিক প্রার্থীর মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেওয়া এবং অন্যদের তাঁর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করা। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্ভাব্য প্রার্থীদের মোকাবিলা এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে কৌশল নির্ধারণও দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আগে থেকেই মাঠে জামায়াত
ইউপি নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির তুলনায় আগে থেকেই মাঠ গোছাতে শুরু করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে অনেক ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বেশ কিছু এলাকায় তাদের প্রার্থীরা ইতোমধ্যে জনসংযোগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেছেন।
দলীয় সূত্র বলছে, প্রার্থী বাছাইয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনকে আরও সক্রিয় করার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসবে, ততই মাঠপর্যায়ের প্রচার ও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
দলীয় প্রতীক থাকছে না
সংশোধিত আইন অনুযায়ী আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বা দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ থাকছে না। তবে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ও চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে স্থানীয় পর্যায়ে একক প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন নির্দলীয় হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় প্রভাব ও সমর্থন নির্বাচনের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসবে ইসি
নির্দলীয় ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ও করবে কমিশন।
সানাউল্লাহ জানান, আগামী ২৩, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর নিবন্ধনের ক্রম অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। প্রতিটি দল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
বর্তমানে দেশে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৬০টি। দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হবে নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে তাদের মতামত নেওয়া এবং সহযোগিতা চাওয়া।
সানাউল্লাহ বলেন, সংসদ নির্বাচন যেভাবে সুশৃঙ্খলভাবে এবং কোনো ধরনের বড় ধরনের গোলযোগ ছাড়াই সম্পন্ন করা হয়েছে, একইভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে চায় কমিশন।
স্বাধীনতার পর দেশে এ পর্যন্ত ১০ দফায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম ইউপি নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালে। এরপর ১৯৭৭, ১৯৮৩, ১৯৮৮, ১৯৯২, ১৯৯৭, ২০০৩, ২০১১, ২০১৬ এবং সর্বশেষ ২০২১ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
সর্বশেষ নির্বাচনের পর অনেক ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি বা দায়িত্ব পালনে অক্ষমতার কারণে স্থানীয় সেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে এসব পরিষদে আবার স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।
