মেসি হাঁটেন, দেখেন, তারপরই বদলে দেন ম্যাচের গল্প
লিওনেল স্কালোনিকে আর্জেন্টিনা দলের ফুটবলাররা মজা করে ‘কাঁদুনে বাচ্চা’ বলে ডাকেন। কারণ, আবেগের মুহূর্তে চোখের জল ধরে রাখতে পারেন না তিনি। সময়ের সঙ্গে যেন সেই পরিচয় এখন লিওনেল মেসির সঙ্গেও মানিয়ে গেছে। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের চোখের অশ্রু এখন কোটি কোটি সমর্থকের অনুভূতির প্রতিচ্ছবি। তাঁর কান্না মানেই ভক্তদের হৃদয়েও আবেগের ঢেউ।
আটলান্টার মাঠে শেষ বাঁশি বাজার পর ঠিক তেমনই এক দৃশ্যের জন্ম হলো। ম্যাচ শেষ হতেই সতীর্থদের কাঁধে মাথা রেখে শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন মেসি। তবে সেই কান্না ছিল না হতাশার; ছিল স্বস্তির, ছিল লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আনন্দের। একসময় মনে হচ্ছিল, হয়তো এই ম্যাচেই বিশ্বকাপে শেষ হয়ে যাবে তাঁর যাত্রা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ম্যাচই হয়ে উঠল আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের সূচনা।
মেসি হাঁটেন, দেখেন, তারপরই বদলে দেন ম্যাচের গল্প………….
ম্যাচ শেষে ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা বলেন, “এটা ছিল স্বস্তির কান্না। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার মুহূর্তটা খুব কঠিন ছিল। আমরা কোনোভাবেই বিশ্বকাপ ছেড়ে বাড়ি ফিরতে চাইনি।”
মেসির গল্প কখনোই কেবল গোলের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকে না। বয়সের কারণে তিনি আর আগের মতো পুরো মাঠজুড়ে দৌড়ে বেড়ান না। বরং ধীরে হাঁটেন, চারপাশ পর্যবেক্ষণ করেন, খেলার ছন্দ বোঝেন এবং সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা করেন। আর যখন সেই মুহূর্ত আসে, তখনই নিজের অনন্য ফুটবল মেধা ও দক্ষতায় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন।
মিসরের বিপক্ষে ম্যাচেও দেখা গেল সেই পরিচিত মেসিকে। একটি গোলে অ্যাসিস্ট করার পাশাপাশি নিজেও একটি গোল করেন তিনি। একই সঙ্গে গড়েন নতুন ইতিহাস। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি ভিন্ন আসরে অ্যাসিস্ট করার অনন্য কীর্তি এখন শুধুই তাঁর।
বিশ্বকাপে মেসির মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১-এ। চলতি আসরে এটি তাঁর অষ্টম গোল, যা তাঁকে আবারও গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এগিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি এক বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডেও স্পর্শ করেছেন তিনি। ১৯৩০ সালে গুইলারমো স্ট্যাবিলে করেছিলেন ৮ গোল। এবার সেই রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন মেসিও। সামনে সুযোগ রয়েছে রেকর্ডটি এককভাবে নিজের করে নেওয়ার।
বিশ্বকাপে টিকে থাকার লড়াইয়ে এবার কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। আর সব নজর থাকবে মেসির দিকেই।
হয়তো এখন তিনি আগের চেয়ে বেশি হাঁটেন। বেশি সময় নিয়ে খেলা পড়েন। কিন্তু যখন দলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়, তখনই তিনি হয়ে ওঠেন সবচেয়ে ভয়ংকর। একটি পাস, একটি স্পর্শ কিংবা একটি গোল—মুহূর্তেই বদলে দিতে পারেন ম্যাচের ভাগ্য।
এ কারণেই মেসি আছেন মানেই আর্জেন্টিনা স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে বিশ্বের কোটি কোটি সমর্থকও। ক্যারিয়ারে সম্ভাব্য প্রায় সব অর্জনই তাঁর ঝুলিতে। তবু জয়ের ক্ষুধা, দেশের জন্য লড়াই করার তাড়না এবং সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানোর ইচ্ছা আজও একটুও কমেনি।
হাঁটেন, দেখেন, অপেক্ষা করেন—তারপর এক মুহূর্তেই লিখে ফেলেন নতুন ইতিহাস। এটাই লিওনেল মেসি। এটাই ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর একটি।
