মেসির সামনে ইংলিশ চ্যালেঞ্জ, জমে উঠছে বিশ্বকাপের অলিখিত ফাইনাল
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের সমীকরণ অনেকের প্রত্যাশামতোই মিলেছে। একদিকে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে নরওয়েকে বিদায় করে সেমিফাইনালে উঠেছে ইংল্যান্ড। ফলে ফুটবলপ্রেমীরা এখন অপেক্ষা করছেন বহুল প্রতীক্ষিত আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড লড়াইয়ের, যাকে অনেকেই ইতোমধ্যে “অলিখিত ফাইনাল” বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
২০২২ সালে তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পাওয়ার পর এবার চতুর্থ শিরোপার স্বপ্ন দেখছে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি ইংল্যান্ডের সামনে। দীর্ঘ ছয় দশকের অপেক্ষা ঘোচানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে থ্রি লায়ন্সরা। ফলে দুই ঐতিহ্যবাহী ফুটবল শক্তির এই লড়াই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচ হয়ে উঠতে যাচ্ছে।
মেসির সামনে ইংলিশ চ্যালেঞ্জ, জমে উঠছে বিশ্বকাপের অলিখিত ফাইনাল………..
স্পেন-ফ্রান্স সেমিফাইনাল যতই আলোচনায় থাকুক, ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও নেইমারের বিদায়ের পর বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এখন লিওনেল মেসি। অনেকের মতে, আর্জেন্টিনা বিদায় নিলে বিশ্বকাপের আবেগের বড় একটি অংশও হারিয়ে যাবে।
লাতিন আমেরিকার ফুটবলের শেষ বড় আশা এখন আর্জেন্টিনা। সেই দলের নেতৃত্বে রয়েছেন মেসি, যার সামনে এবার ইংলিশ পরীক্ষার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের লড়াইয়ের ইতিহাস থাকলেও, এই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মেসির মাঠে নামা হয়নি আগে। তাই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সম্ভাব্য এই ম্যাচটি হতে যাচ্ছে তার জন্যও এক নতুন অধ্যায়।
বিশ্বকাপে ১৯৬২ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। এর মধ্যে ইংল্যান্ড তিনবার জয় পেয়েছে, আর আর্জেন্টিনা জিতেছে দুবার, যার একটি ছিল টাইব্রেকারে। সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। সেই ম্যাচে দিয়েগো ম্যারাডোনার দুটি ঐতিহাসিক গোল—বিশেষ করে ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’—আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।
এবার সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নতুন গল্প লেখার অপেক্ষায় আর্জেন্টিনা। ৩৯ বছর বয়সেও মেসির জাদুকরী উপস্থিতি ফুটবলপ্রেমীদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে আরেকটি স্মরণীয় রাতের।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি সহজ হবে বলেই ধারণা ছিল। শুরুটাও হয়েছিল দারুণভাবে। ম্যাচের ১০ মিনিটে মেসির নিখুঁত পাস থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার।
তবে এরপর ম্যাচের চিত্র পাল্টে যায়। সুইজারল্যান্ড ধীরে ধীরে খেলায় ফিরে আসে এবং ৬৭ মিনিটে ড্যান এনদোয় গোল করে সমতায় ফেরান দলকে। গোলটি হজম করার পর কিছু সময় চাপে পড়ে যায় আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলোর লাল কার্ডে। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার পর ১০ জনের দলে পরিণত হয় সুইজারল্যান্ড। তবুও শেষ পর্যন্ত দারুণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে তারা।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটে নিষ্পত্তি না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ১১২ মিনিটে দূরপাল্লার দুর্দান্ত শটে জাল খুঁজে পান হুলিয়ান আলভারেজ। এরপর যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্টিনেজ আরেকটি গোল করে আর্জেন্টিনার ৩-১ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন।
ম্যাচ শেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। উচ্ছ্বাসের মাঝেও তিনি স্বীকার করেন, জয় পেতে ভাগ্যের সহায়তাও পেয়েছে তার দল।
গ্রুপ পর্বে টানা তিন জয় পেলেও নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচেই কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা। শেষ ষোলোতে নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয়, কোয়ার্টার ফাইনালে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়াই—সব মিলিয়ে দলটি সহজ পথ পাড়ি দেয়নি।
এবার সামনে আরও কঠিন প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা, ডেকলান রাইসসহ ইংলিশ আক্রমণভাগ যে কোনো রক্ষণভাগের জন্য বড় হুমকি। অন্যদিকে মেসির অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা এবং আর্জেন্টিনার দলগত সমন্বয়ই হতে পারে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তাই মুখোমুখি হচ্ছে দুই ফুটবল পরাশক্তি। একদিকে মেসির শেষ বিশ্বমঞ্চের স্বপ্ন, অন্যদিকে ইংল্যান্ডের ৬০ বছরের অপেক্ষা। ইতিহাস, আবেগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর শিরোপার হাতছানি—সব মিলিয়ে ফুটবল বিশ্বের চোখ এখন একটাই ম্যাচে, আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড।
