কিশোর গ্যাংয়ের আতঙ্কে সন্তানকে নিরাপদ রাখতে দুই মায়ের লড়াই
সন্তানের বয়স যত বাড়ছে, ততই যেন বাড়ছে মা-বাবার দুশ্চিন্তা। বিশেষ করে কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও নানা ধরনের অপরাধের খবর এখন অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে। সন্তানকে বিপথে যাওয়া থেকে দূরে রাখা, আবার অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ না করা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাও হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ।
কিশোর গ্যাংয়ের আতঙ্কে সন্তানকে নিরাপদ রাখতে দুই মায়ের লড়াই……
মোহাম্মদপুরের তামান্না ইয়াসমিন এবং উত্তরার লাকি রহমান—দুই মা নিজেদের মতো করে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন। সন্তানদের নিরাপদ রাখতে তাঁরা নজর রাখছেন, আবার পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সৃজনশীল ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও যুক্ত করছেন।
স্কুল থেকে ফেরার পথে অনুসরণ
মোহাম্মদপুরের সেন্ট জোসেফ স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওশানের বয়স ১৬ বছর। প্রায় তিন মাস আগে স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে এক তরুণ তাকে অনুসরণ করছিলেন। বারবার একটি কাগজ দেখার জন্য বলা হলেও তাঁর আচরণ ও গতিবিধি ওশানের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়।
একপর্যায়ে ভয় পেয়ে ওশান দৌড়ে একটি দোকানে ঢুকে পড়ে। সেখানে থাকা লোকজনকে বিষয়টি জানালে তাঁরা বাইরে বেরিয়ে আসেন। তবে ততক্ষণে ওই তরুণ সরে পড়েছেন।
কিশোর গ্যাংয়ের আতঙ্কে সন্তানকে নিরাপদ রাখতে দুই মায়ের লড়াই…..
ঘটনাটি ছেলেকে আতঙ্কিত করেছে, একই সঙ্গে ভয় ধরিয়েছে মা তামান্না ইয়াসমিনকেও। কারণ এর আগে ওশানের দুই বন্ধু একই ধরনের অপরাধের শিকার হয়েছিল। একজনের কাছ থেকে মুঠোফোন এবং অন্যজনের কাছ থেকে সাইকেল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
তামান্না বলেন, “খুব আতঙ্ক লাগে। কত আর চোখে চোখে রাখা যায়!”
নজরদারির বদলে আস্থার সম্পর্ক
তামান্না ও তাঁর স্বামী মো. এনায়েত উল্লাহর বাস মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে। তাঁদের আরেক সন্তান ছয় বছরের আলিনা ইসলাম।
তামান্নার কাছে ছেলের মুঠোফোনসহ বিভিন্ন ডিভাইসের পাসওয়ার্ড রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, বর্তমান সময়ে সন্তানদের প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা সম্ভব নয়। বরং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখানো এবং সন্তানের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।
কিশোর গ্যাংয়ের আতঙ্কে সন্তানকে নিরাপদ রাখতে দুই মায়ের লড়াই….
ওশানকে খারাপ সঙ্গ থেকে দূরে রাখতে স্কুলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করেছেন তিনি। ওশান আইটি ক্লাব ও সায়েন্স ক্লাবের সদস্য। চলতি বছর সায়েন্স ক্লাবের নিউক্লিয়াস সাময়িকী প্রকাশের দায়িত্বও পালন করেছে সে।
গত বছর বইমেলায় ওশানের ইংরেজি কবিতার বই পেট্যালস্ বিনেথ অ্যাশেস প্রকাশিত হয়েছে।
তামান্নার মতে, নিরাপত্তাহীনতার কারণে শিশু-কিশোরদের ঘরবন্দী করে রাখা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তাঁর ভাষায়, একজন কিশোরেরও নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার আছে।
সন্তানের কথা যেন সন্তান নিজেই বলতে পারে
শিশু অধিকারবিষয়ক সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার মনে করেন, কৈশোরে অতিরিক্ত নজরদারি অনেক সময় সন্তানদের কাছে খবরদারি মনে হতে পারে।
তাঁর মতে, কিশোরের ব্যক্তিগত প্রতিটি বিষয়ে নজরদারি না করে তার আগ্রহ ও পছন্দকে সম্মান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো সমস্যা হলে সন্তান ভয় না পেয়ে মা-বাবার সঙ্গে কথা বলতে পারে।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞার চেয়ে ইতিবাচক ব্যবহার শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
উত্তরায় লাকির অন্যরকম লড়াই
উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা লাকি রহমান কর্মজীবী। তাঁর ছেলে সাফওয়ান রহমানের বয়স ১৩ বছর। সে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বড় মেয়ে সাওদা রহমান পড়ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ব্যস্ততার মধ্যেও ছেলের নিরাপত্তা নিয়ে সব সময় সতর্ক থাকেন লাকি। প্রতিদিন সাফওয়ানের জন্য ৫০ টাকা বরাদ্দ থাকে—৩০ টাকা যাতায়াতের জন্য এবং ২০ টাকা টিফিনের জন্য। যোগাযোগের প্রয়োজনে বাসায় তার জন্য রাখা হয়েছে একটি বাটন ফোন।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু-কিশোরদের ওপর হামলা ও হত্যার খবর তাঁকে আরও উদ্বিগ্ন করেছে।
সন্তানকে আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে পাঁচ মাস আগে সাফওয়ানকে কারাতে ক্লাসে ভর্তি করেছেন তিনি। পাশাপাশি সাফওয়ান স্কুলের ডিবেট ক্লাবের সদস্য, আবৃত্তি করে এবং স্কাউটেও যুক্ত হয়েছে। পড়াশোনায় ভালো ফলের পাশাপাশি প্রতিবছর ‘অলরাউন্ডার’ ও ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার পেয়েছে সে।
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সুফল
সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন লাকি। সপ্তাহে অন্তত এক দিন পরিবারের সবাই মিলে সিনেমা দেখেন।
একবার সাফওয়ানের এক বন্ধু তাকে প্রাপ্তবয়স্কদের একটি সিনেমার নাম চিরকুটে লিখে দিয়েছিল। বিষয়টি সাফওয়ান মায়ের কাছে বলেছিল। লাকি মনে করেন, মা-ছেলের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক না থাকলে হয়তো ঘটনাটি তাঁর জানা হতো না।
তিনি বলেন, সন্তানকে কোনো বন্ধুর সঙ্গে মিশতে নিষেধ করার চেয়ে ভালো-মন্দ বুঝে চলতে শেখানো বেশি জরুরি।
লাকির ভাষায়, “সন্তানদের এমনভাবে বড় করা উচিত, যাতে তারা তাদের সব কথা মা-বাবাকে এসে বলতে পারে।”
নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়
উত্তরার যে এলাকায় লাকি থাকেন, তার কাছেই ২০১৭ সালে সমবয়সীদের হাতে খুন হয়েছিল ১৪ বছর বয়সী আদনান কবির। সেই ঘটনার পর কিশোর গ্যাং নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
নাম ‘কিশোর গ্যাং’ হলেও এসব অপরাধী চক্রে অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্করাও যুক্ত থাকে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। মাদক, ছিনতাই, হত্যা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিশোরদের ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
লাকি মনে করেন, পরিবার যতটা সম্ভব চেষ্টা করলেও সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু মা-বাবার নয়।
তিনি বলেন, “আমরা বাচ্চাদের জন্য যতটুকু পারি করছি। সরকার ও সমাজের দায়িত্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তারা এই দায়িত্ব পালন না করলে আমরা সন্তানদের পেছনে যে খাটুনি দিচ্ছি, তার সবই বৃথা হয়ে যাবে।”
শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশের সমস্যা
কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে সারা দেশে প্রায় ২৩৭টি কিশোর গ্যাং থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর কিশোর গ্যাং ও কিশোর অপরাধ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে স্থানীয়দের বক্তব্য রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও জরুরি।
সবার পক্ষে ব্যয়বহুল উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব নয়
শিশু বিকাশ ও অভিভাবকত্ব বিশেষজ্ঞ এবং হেভেন এডুকেশন সার্ভিসেসের প্রধান পরামর্শক আঞ্জুমান পারভীনের মতে, সব পরিবারের পক্ষে সন্তানকে আলাদা করে ক্লাব, আত্মরক্ষা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার জন্য অর্থ ব্যয় করা সম্ভব নয়।
তাই শুধু পরিবারের ওপর দায়িত্ব না দিয়ে স্কুল ও স্থানীয় পর্যায়েও শিশুদের জন্য নিরাপদ ও গঠনমূলক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর মতে, স্কুলগুলোকে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের দিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারের উদ্যোগে এলাকাভিত্তিক এমন কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা দরকার, যেখানে সব শিশু অংশ নিতে পারবে এবং নিরাপত্তাও থাকবে।
লায়লা খন্দকারও মনে করেন, শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিকাশের জন্য মাঠ, পার্ক ও খেলার জায়গা থাকা জরুরি। এসব স্থানে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্বও সরকারের।
শেষ পর্যন্ত তামান্না ও লাকির অভিজ্ঞতা একটি বিষয়ই সামনে আনে—সন্তানকে শুধু ঘরে রেখে নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়। আবার পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়াও সমাধান নয়। প্রয়োজন এমন এক পরিবেশ, যেখানে পরিবার সন্তানের পাশে থাকবে, সন্তান নিজের কথা নির্ভয়ে বলতে পারবে এবং বাইরে তার চলাফেরার জন্যও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
