যুদ্ধের আশঙ্কা, নাকি বড় দুর্যোগের প্রস্তুতি? বিশ্বজুড়ে নাগরিকদের খাবার-পানি মজুতের পরামর্শ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নাগরিকদের অন্তত তিন দিন থেকে এক সপ্তাহের খাবার, পানি ও জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, সুইডেন, নরওয়ে, জার্মানি ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে সরকারের এমন উদ্যোগ ঘিরে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাহলে কি বিশ্ব নতুন কোনো যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, নাকি সামনে অপেক্ষা করছে বড় কোনো বিপর্যয়?
যুদ্ধের আশঙ্কা, নাকি বড় দুর্যোগের প্রস্তুতি? বিশ্বজুড়ে নাগরিকদের খাবার-পানি মজুতের পরামর্শ……..
সরকারি নির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই প্রস্তুতির পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই। বরং প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার হামলা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিপর্যয় এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মতো বহুমুখী ঝুঁকি মোকাবিলায় নাগরিকদের প্রস্তুত রাখতেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতির আহ্বান
সম্প্রতি যুক্তরাজ্য সরকার ‘বি রেডি’ (Be Ready) নামে একটি জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি শুরু করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, বড় কোনো সংকট দেখা দিলে অন্তত প্রথম ৭২ ঘণ্টা যেন নাগরিকেরা জরুরি সেবার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজেদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন।
সরকারি নির্দেশনায় পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য প্রতিদিন তিন লিটার করে পানীয় জল, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য শুকনো ও টিনজাত খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পাওয়ার ব্যাংক, টর্চলাইট এবং ব্যাটারিচালিত বা হাতল ঘুরিয়ে চালানো যায় এমন রেডিও রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকারের মতে, আকস্মিক বন্যা, ভয়াবহ ঝড় কিংবা সাইবার হামলার কারণে জাতীয় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে সবার কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যায়। তাই নাগরিকেরা নিজেদের প্রয়োজনীয় রসদ নিয়ে কয়েক দিন চলতে পারলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সহায়তা করা সহজ হবে।
নির্দেশনার প্রভাব পড়েছে বাজারেও
সরকারের এই পরামর্শের পর যুক্তরাজ্যের বাজারে জরুরি প্রস্তুতির সামগ্রীর চাহিদা বেড়েছে। দেশটির সুপারমার্কেট চেইন আইসল্যান্ডে টিনজাত খাবারের বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে রেডিওর বিক্রি বেড়েছে ১৬০ শতাংশ এবং টর্চলাইটের বিক্রি প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
তবে খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। দেশে কোনো খাদ্যসংকট তৈরি হয়নি। অর্থাৎ সরকারি সতর্কতাকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে প্রস্তুতি নেওয়ার আগ্রহ বাড়লেও তা সরাসরি খাদ্যসংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
দেশভেদে প্রস্তুতির ধরন আলাদা
যুক্তরাজ্যের মতো কানাডা, জাপান, মেক্সিকো ও নেদারল্যান্ডসেও নাগরিকদের অন্তত তিন দিনের জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নিউজউইক।
অন্যদিকে সুইডেন ও নরওয়ে নাগরিকদের অন্তত এক সপ্তাহের প্রয়োজনীয় খাবার ও পানি মজুত রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। জার্মানির প্রস্তুতির পরিকল্পনায় রয়েছে প্রায় ১০ দিনের জরুরি রসদ সংরক্ষণের বিষয়টি।
তবে সব দেশের ঝুঁকি এক নয়। জাপানের প্রস্তুতির বড় অংশজুড়ে রয়েছে ভূমিকম্প, সুনামি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকোর মতো দেশে ঘূর্ণিঝড়সহ চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ মোকাবিলা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইউরোপে বাড়ছে ভূরাজনৈতিক ও সাইবার নিরাপত্তার উদ্বেগ
ইউরোপের দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক সংঘাতের ঝুঁকিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইউরোপীয় কমিশনের ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’তে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির পাশাপাশি সাইবার হামলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং বহিরাগত আগ্রাসনের আশঙ্কা মোকাবিলার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশেষ করে সুইডেনের ‘ইফ ক্রাইসিস অর ওয়ার কামস’ শীর্ষক নির্দেশিকায় সাধারণ সংকটের পাশাপাশি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে হবে, সে বিষয়েও নাগরিকদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের প্রস্তুতি সুইডেন ও উত্তর ইউরোপের দেশগুলোর জন্য নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এসব দেশে নাগরিক প্রতিরক্ষা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সংস্কৃতি চালু রয়েছে। তাই এ ধরনের নির্দেশনাকে আসন্ন যুদ্ধের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সামরিক ঘাঁটিতে ৯০ দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
নাগরিকদের পাশাপাশি সামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ও স্বনির্ভরতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘ফোর্ট্রেস আমেরিকা’ উদ্যোগের আওতায় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলোকে বাইরের সরবরাহ ছাড়াই অন্তত ৯০ দিন সচল রাখার পরিকল্পনা করছে।
এই পরিকল্পনায় সামরিক ঘাঁটিগুলোর নিজস্ব জ্বালানি ও বিদ্যুৎব্যবস্থা নিশ্চিত করা, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং জরুরি সরঞ্জাম ও রসদের মজুত বাড়ানোর বিষয় রয়েছে।
তবে এই ৯০ দিনের প্রস্তুতি মূলত সামরিক স্থাপনাগুলোর কার্যক্রম সচল রাখার অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা। সাধারণ নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার এমন কোনো নির্দেশনা জারি করেনি।
তাহলে কি আসন্ন যুদ্ধের আশঙ্কা রয়েছে?
সবকিছু মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সরকারি প্রস্তুতিমূলক নির্দেশনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—বিশ্বজুড়ে নাগরিকদের খাবার-পানি মজুত রাখার পরামর্শের পেছনে তাৎক্ষণিক কোনো বিশ্বযুদ্ধ বা মহাবিপর্যয় আসন্ন হওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
বরং আধুনিক বিশ্বে একটির সঙ্গে অন্যটি জড়িয়ে থাকা নানা ঝুঁকি মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলো আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে চাইছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘন ঘন চরম আবহাওয়া, ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাইবার হামলা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব—সবকিছুই এখন জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এসব নির্দেশনার মূল বার্তা আতঙ্ক ছড়ানো নয়, বরং সচেতনতা তৈরি করা। কোনো বড় সংকট দেখা দিলে প্রথম কয়েক দিন যেন সাধারণ মানুষ অন্তত নিজেদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন, সেটিই এই উদ্যোগগুলোর প্রধান লক্ষ্য।
অর্থাৎ, বিশ্বজুড়ে খাবার ও পানি মজুতের এই আহ্বানকে আসন্ন যুদ্ধের সংকেত না ভেবে সম্ভাব্য যেকোনো দুর্যোগ ও অচলাবস্থা মোকাবিলায় আগাম নাগরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখাই যুক্তিযুক্ত
