বাংলাদেশ

আশুলিয়ায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে আহত দেড় শতাধিক, কাভার্ড ভ্যানে আগুন; ২৩০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা

ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে শিল্পাঞ্চল। মজুরি বৃদ্ধি ও বিভিন্ন দাবিতে টানা পঞ্চম দিনের মতো বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকরা। সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। এতে দেড় শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সংঘর্ষের মধ্যে একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সাভার ও আশুলিয়ার প্রায় ২৩০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

সোমবার সকাল ১০টার পর আশুলিয়ার নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়। শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরাতে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ ব্যবহার করে। অন্যদিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের একাংশ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।

আশুলিয়ায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে আহত দেড় শতাধিক, কাভার্ড ভ্যানে আগুন; ২৩০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা….

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে প্রথমে অনন্ত গ্রুপের একটি কারখানার সামনে শ্রমিকরা জড়ো হন। পরে হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনেও বিক্ষোভ শুরু হয়। বিভিন্ন দাবিতে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।

সংঘর্ষের সময় বেলা ১২টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুরে নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে একটি পোশাক কারখানার কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। এতে শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ে।

এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নরসিংহপুরের নিউএজ কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি শেষে কারখানা থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরাও আন্দোলনে যোগ দেন। একপর্যায়ে সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসহ আশপাশের সড়কগুলোতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।

পুলিশ সদস্যও আহত, গ্রেপ্তার ২

শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষে ইটপাটকেলের আঘাতে শিল্প পুলিশ-১-এর এএসপি (অপারেশনস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স) শোয়েব আহমেদ সামান্য আহত হয়েছেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। এ ঘটনায় পুলিশেরও বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম জানান, শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় দুপুর দেড়টার দিকে বাইপাইল এলাকা থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা শ্রমিক নাকি বহিরাগত, তা যাচাই করা হচ্ছে।

দুপুর দেড়টা পর্যন্ত শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মুখোমুখি অবস্থানে ছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

২৩০ কারখানায় সাধারণ ছুটি

সংঘর্ষ, বিক্ষোভ ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে আশুলিয়া ও সাভারের অধিকাংশ পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। গত কয়েক দিনের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এ পর্যন্ত প্রায় ২৩০টি গার্মেন্টস কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

শিল্প পুলিশ সূত্রের অভিযোগ, বহিরাগত কিছু ব্যক্তি শ্রমিকদের আন্দোলনে উসকানি দিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এমনকি কিছু কারখানার শ্রমিকদের কর্মস্থল ছেড়ে সড়কে নামতে বাধ্য করা হচ্ছে বলেও দাবি পুলিশের। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আন্দোলন নিয়ে উদ্বেগ সংসদ সদস্যের

শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের কারণে সৃষ্ট যানজট পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন সাভারের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু। এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, পতিত সরকারের দোসর ও বহিরাগতরা শ্রমিকদের কর্মসূচিতে যুক্ত হয়ে পোশাকশিল্পে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, বহিরাগতদের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। তবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ কয়েক দফা দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিক্ষোভকারীদের অনেকে।

টানা আন্দোলন, সংঘর্ষ ও কারখানা বন্ধের ঘটনায় দেশের অন্যতম বৃহৎ পোশাকশিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি ও শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।