‘১০ লাখ টাকা খরচ করেও একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না’
দুই মেয়ের পর জন্ম নেওয়া একমাত্র ছেলে আরশাদ উল্লাহ চৌধুরী মাহিনকে ঘিরেই ছিল বাবা-মায়ের সব স্বপ্ন। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে, কয়েক বছরের মধ্যে পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে—ছেলেকে নিয়ে এমনই পরিকল্পনা ছিল অবসরপ্রাপ্ত স্টোরম্যান মাহবুবুল বশর চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী নুর বেগমের।
‘১০ লাখ টাকা খরচ করেও একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না’….
কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই তাঁদের সব স্বপ্ন কেড়ে নিল। ১৮ বছর বয়সী আরশাদকে বাঁচাতে বাবার জমানো টাকা, অবসরকালীন ভাতার অর্থ—সব মিলিয়ে ১০ লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে। তবু শেষ পর্যন্ত ছেলেকে হারাতে হলো তাঁকে।
গত মঙ্গলবার সকালে হাটহাজারী উপজেলার নাঙ্গলমোড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে আরশাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। শোকে ভেঙে পড়েছেন বাবা-মা। কখনো কান্নায় বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন বাবা, আবার কখনো ছেলের কথা মনে করে নির্বাক হয়ে যাচ্ছেন মা।
‘১০ লাখ টাকা খরচ করেও একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না’….
গত বুধবার দুপুরে হাটহাজারীর মির্জাপুর ইউনিয়নের চারিয়া বোর্ড স্কুলের সামনে একটি ব্যক্তিগত গাড়ির সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে দুই গাড়ির নয়জন আহত হন। ঘটনাস্থলেই মারা যান অটোরিকশাচালক মুহাম্মদ এরশাদ (৩৮)। গুরুতর আহত হন এইচএসসি পরীক্ষার্থী আরশাদ উল্লাহ।
‘১০ লাখ টাকা খরচ করেও একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না’….
দুর্ঘটনার পর প্রথমে তাঁকে হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচ দিন পর তাঁর মৃত্যু হয়।
‘১০ লাখ টাকা খরচ করেও একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না’
সোমবার রাত ১০টার দিকে আরশাদের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছায়। সেদিন রাতেই তাঁকে দাফন করা হয়।
ছেলের শেষ সময়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মাহবুবুল বশর। তিনি বলেন, সেদিন দুপুরে পরীক্ষা দিতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাঁর ছেলে। ছেলেকে বিদায় দিয়ে তিনি জোহরের নামাজ পড়তে যান। নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথেই খবর পান, পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে আরশাদ।
‘১০ লাখ টাকা খরচ করেও একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না’..
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে ছুটে যান তিনি। সেখানে ছেলের শরীর রক্তে ভেজা অবস্থায় দেখতে পান। আরশাদ তখন কথা বলতেও পারছিল না।
মাহবুবুল বশর বলেন, “ছেলেকে বাঁচানোর জন্য আমার সব জমানো টাকা খরচ করেছি। ১০ লাখ টাকার বেশি খরচ করেও আমার বুকের ধনকে বাঁচাতে পারলাম না। আমার একটিমাত্র ছেলে ছিল, তাকেই হারালাম।”
দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আরশাদই ছিলেন বাবা-মায়ের সবচেয়ে কাছের। বড় দুই মেয়ে রুমি আকতার ও ঊর্মি আকতারের স্বামীরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকেন। ফলে ছেলেকে ঘিরেই ছিল এই দম্পতির অবসরজীবনের নানা স্বপ্ন।
‘১০ লাখ টাকা খরচ করেও একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না’….
আরশাদের চাচাতো ভাই ও ব্যবসায়ী মুহাম্মদ ফারুক বলেন, ভাতিজাকে বাঁচাতে মাহবুবুল বশর অবসরকালীন ভাতা ও দীর্ঘদিনের জমানো অর্থ ব্যয় করেছেন। চিকিৎসায় প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হলেও শেষ পর্যন্ত আরশাদকে আর ফিরে পাওয়া যায়নি।
আরশাদ হাটহাজারী সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে সহপাঠী, শিক্ষক ও স্থানীয়দের মধ্যে শোক নেমে এসেছে।
‘১০ লাখ টাকা খরচ করেও একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না’….
কলেজের প্রভাষক মো. আবু তালেব বলেন, আরশাদের মৃত্যুতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গভীরভাবে শোকাহত। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে প্রশাসনের আরও কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
‘১০ লাখ টাকা খরচ করেও একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না’…
একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি তরুণ প্রাণই কেড়ে নেয়নি, মুহূর্তে থামিয়ে দিয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্নও। যে ছেলেকে ঘিরে বাবা-মায়ের ছিল ভবিষ্যতের এত পরিকল্পনা, সেই ছেলের স্মৃতিই এখন তাঁদের ঘরজুড়ে।
