‘আমগাছটা না থাকলে আমি ভেসে মারা যেতাম’
নেপালে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও ভয়াবহ ভূমিধসে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে চলেছে। দেশটির বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও আশপাশের কয়েকটি জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন চার শতাধিক মানুষ, যাঁদের মধ্যে অনেকেই বিদেশি নাগরিক।
এই ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যেও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন ২৪ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক বিবেক কুমাল। তাঁর বেঁচে যাওয়ার গল্প যেন অলৌকিক।
‘আমগাছটা না থাকলে আমি ভেসে মারা যেতাম’……
বুধবার বিদুর এলাকায় একটি নতুন বাড়ি নির্মাণের কাজে ছিলেন বিবেক। বাড়ির বাইরে শৌচাগার তৈরির জন্য গর্ত খুঁড়ছিলেন তিনি। গর্তটি ছিল প্রায় পাঁচ ফুট গভীর। হঠাৎ চারপাশে অস্বাভাবিক ‘হিস হিস’ শব্দ শুনতে পান তিনি।
তখন গর্তের ওপরে থাকা চার সহকর্মী তাঁকে দ্রুত উঠে এসে পালিয়ে যেতে বলেন। কিন্তু বিবেক গর্ত থেকে বের হওয়ার আগেই তাঁরা দৌড়ে নিরাপদ জায়গায় চলে যান। তিনিও বের…. হওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু তার আগেই পাহাড়ি ঢল নেমে আসে।
‘আমগাছটা না থাকলে আমি ভেসে মারা যেতাম’……
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ভাই দিনেশকে পাশে রেখে বিবেক বলেন, “আমি দৌড়াতে শুরু করি। এরপর ভূমিকম্পের মতো কাঁপুনি আর বিকট শব্দের সঙ্গে ঢল নেমে আসে।”
প্রবল স্রোতে ভেসে যান তিনি। কাদা, পানি ও পাথরের স্রোত তাঁকে অনেক দূর টেনে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে একটি আমগাছের সঙ্গে আটকে যান বিবেক। সেই গাছটিই হয়ে ওঠে তাঁর জীবন বাঁচানোর শেষ আশ্রয়।
‘আমগাছটা না থাকলে আমি ভেসে মারা যেতাম’
“ভাগ্য ভালো ছিল বলে আমি একটি আমগাছে আটকে যাই। গাছটা না থাকলে আমি ভেসে মারা যেতাম,” বলেন বিবেক।
আমগাছটি আঁকড়ে ধরে তিনি দেখতে পান, যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও কাজ করছিলেন, সেটিও ঢলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। চোখের সামনে মুহূর্তেই পুরো ভবনটি অদৃশ্য হয়ে যায়।
পরে পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে। ঢলের প্রচণ্ড স্রোত এবং পরে একটি বড় পাথরের আঘাতে তাঁর ডান পায়ে চোট লাগে। বর্তমানে কাঠমান্ডুর ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন বিবেক। একই হাসপাতালে আরও কয়েকজন আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ১১৪ জনের বেশি মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের কাঠমান্ডু ও রসুয়া জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালের বাইরে আহতদের স্বজন, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড়ও বাড়ছে।
ধ্বংসস্তূপে শুধু কাদা আর পাথর
নেপাল-তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন রসুয়া ও আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র পাওয়া গেছে। নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, বিশাল পাথর, কাদা ও পানির ঢল নেমে আসার আগে অনেক মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন। এরপর সেই স্রোত ভবন ও যানবাহন পর্যন্ত ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
‘আমগাছটা না থাকলে আমি ভেসে মারা যেতাম’….
ভূমিধসের সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস জানিয়েছে, ওই ঘটনার প্রায় সাত মিনিট আগে সেখানে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদ থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।
ভূমিকম্পেও বেঁচেছিলেন বিবেক
নেপাল হিমালয়ঘেরা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশ। বর্ষা মৌসুমে সেখানে প্রায়ই বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পেও প্রায় ৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন। তখন কিশোর বয়সী বিবেকও সেই দুর্যোগের মধ্য দিয়ে বেঁচে ফিরেছিলেন।
এবারের দুর্যোগেও ভাগ্য তাঁকে বাঁচিয়ে দিল—একটি আমগাছের কারণে।
তবে বিবেকের মতো সবাই ভাগ্যবান হননি। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে এখনো বহু পরিবার অপেক্ষা করছে।
স্কুল থেকে ফেরার পথেই ঢল
ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারে বিবেকের পাশের বিছানায় চিকিৎসা নিচ্ছে ১১ বছর বয়সী রিহানা লামিছানে। বুধবারের দুর্যোগে সেও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছে।
রিহানা জানায়, সে স্কুলে ছিল। বন্যার কারণে হঠাৎ স্কুল ছুটি দিয়ে সবাইকে বাড়ি ফিরে যেতে বলা হয়। বাড়ি ফেরার পথে নদী পার হওয়ার সময় আচমকা প্রবল স্রোত নেমে আসে।
বুক ও পায়ে আঘাত পেয়েছে রিহানা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সে বলে, “আমি খুশি যে নিরাপদে আছি। কিন্তু আমার বন্ধুদের কী হয়েছে, এখনো জানি না।”
রিহানার মা রিতা মেয়ের খোঁজে ছুটে এসেছিলেন এক বন্ধুর ফোন পাওয়ার পর। মেয়ের বড় কোনো ক্ষতি হয়নি—এতেই তিনি স্বস্তি পেয়েছেন।
‘আমগাছটা না থাকলে আমি ভেসে মারা যেতাম’…
কিন্তু রিহানার সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। ধ্বংসস্তূপ, কাদা আর নিখোঁজ মানুষের তালিকার মধ্যেই চলছে স্বজনদের অপেক্ষা এবং উদ্ধারকর্মীদের অভিযান।
