জাতীয়

বন্ধ শিল্পকারখানা চালু ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের প্রধান লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান


দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি-বেসরকারি শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করা এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, শিল্পকারখানা শুধু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, এগুলো দেশের সম্পদ এবং লাখো শ্রমিকের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ।

বন্ধ শিল্পকারখানা চালু ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের প্রধান লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান…..

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে বাগেরহাটে হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতে যাওয়ার পথে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের কাটাখালী মোড়ে আয়োজিত এক পথসভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের আগে দেশের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পর্যায়ক্রমে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, একসময় খুলনা ছিল দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা কারণে এ অঞ্চলের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার খুলনা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তরের পঞ্চগড় পর্যন্ত নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে চায়। এর মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

শিল্পকারখানায় হামলা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা

প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, একটি মহল দেশের শিল্পকারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে, তারা এখন সীমান্তের ওপার থেকে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।

তারেক রহমান বলেন, দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে নির্বাচিত সরকার যখন কাজ করছে, তখন এসব ষড়যন্ত্রকারীরা সেই উদ্যোগ ব্যাহত করতে চায়। দেশের সম্পদ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় শ্রমিক, সাধারণ মানুষ এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, “আমাদের সামনে লক্ষ্য একটাই—করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।”

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, শিল্পকারখানাগুলো দেশের মানুষের সম্পদ। এগুলো ধ্বংস হলে মালিকপক্ষের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার। তাই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।

দুই মাসের মধ্যে নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের আশা

শ্রমিকদের মজুরি ও বিভিন্ন দাবি-দাওয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনায় সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ড কাজ শুরু করেছে এবং আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বার্থও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে।

মোংলা বন্দরকে আধুনিক অর্থনৈতিক হাব করার পরিকল্পনা

এর আগে সকালে হেলিকপ্টারে মোংলায় পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও জোরদার হবে। নতুন শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পের আওতায় আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, ইয়ার্ড এবং কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। তবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই প্রকল্পের সাফল্য আসবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, বন্দরের সেবার মান কতটা উন্নত হলো, পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কতটা কমল, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল এবং পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকল—এসব বিষয় দিয়েই প্রকল্পের প্রকৃত সফলতা মূল্যায়ন করতে হবে।

তিনি মোংলা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগের কথাও জানান। পাশাপাশি বন্দরের নাব্যতা, নৌপথের নির্ভরযোগ্যতা, জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

একই সঙ্গে মোংলা বন্দরকে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক বন্দরসেবা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনে মোংলা বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

এ সময় তিনি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

মোংলায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) মধ্যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রটোকল ভেঙে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী

খুলনা সফরকালে আনুষ্ঠানিক প্রটোকল উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি মিশে যাওয়ার ঘটনায় আলোচনায় আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

খুলনায় প্রবেশের সময় রূপসা উপজেলার তিলক-কুদির বটতলায় আয়োজিত পথসভায় তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে তিন সদস্যের একটি দল প্রস্তুত ছিল। কিন্তু দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে তাঁকে বহনকারী ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বাসটি সেখানে পৌঁছানোর পর অভ্যর্থনাকারীদের অপেক্ষা না করেই বাস থেকে নেমে যান তিনি।

এরপর সরাসরি সাধারণ মানুষের ভিড়ে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে হাত মেলান এবং কুশল বিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রীর এমন স্বতঃস্ফূর্ত আচরণে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।

পরে বিকেল ৩টা ২১ মিনিটে খুলনা মহানগরীর ডাকবাংলা মোড়ে পৌঁছালে স্থানীয় নেতাদের অনুরোধে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির বাইরে আরেকটি পথসভায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী।

খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সামনে আয়োজিত ওই সভায় তিনি বলেন, খুলনার বন্ধ শিল্পকারখানা দ্রুত চালু করা, এ অঞ্চলের শিল্পাঞ্চলের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান সমস্যার সমাধান সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।

এ সময়ও তিনি বাস থেকে নেমে সাধারণ মানুষের কাছে চলে যান এবং তাঁদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। সভায় জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন এবং খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জুসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

খুলনার শিল্পাঞ্চলের গৌরব ফেরানোর প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা কলকারখানা চালু, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর কথা জানিয়েছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন, উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নই সরকারের মূল লক্ষ্য। বন্ধ শিল্পকারখানায় উৎপাদন ফিরিয়ে আনা এবং নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চায় সরকার।

এদিন সকালে মোংলায় বন্দর প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, কাটাখালীতে পথসভা, বাগেরহাটে হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত এবং খুলনায় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ শেষে বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে হেলিকপ্টারে ঢাকার উদ্দেশে খুলনা ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।