ট্রাম্পের নির্বাচনী পরাজয়ে উল্লাসে মেতেছেন ইরানিরা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে সরব তেহরান
- যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের খবরে উল্লাসে মেতেছেন ইরানের হাজারো মানুষ। তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দূতাবাসের সামনে আয়োজিত বার্ষিক আমেরিকাবিরোধী সমাবেশে ট্রাম্প প্রশাসনকে ঘিরে আনন্দ, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিক্ষোভকারীরা।বুধবার (৫ নভেম্বর) রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ ও ‘ইসরাইল নিপাত যাক’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নীতির সমালোচনা করে বিভিন্ন ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন তারা।সমাবেশে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে একটি বিশাল ব্যানার। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শিকলে বাঁধা রক্তাক্ত বুলডগ হিসেবে তুলে ধরা হয়। শিকলের অপর প্রান্তে দেখানো হয় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আদলে তৈরি শয়তানের মতো একটি চরিত্র।অন্য ব্যানারগুলোতে ইরানের নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলায় তিনি নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।সমাবেশস্থলে আরেকটি বড় ব্যানারে লেখা ছিল, ‘মূল্য কত হবে, তা ইরানের জনগণই নির্ধারণ করেছে।’ এর পাশে বিশ্বের মানচিত্রজুড়ে সারি সারি কালো তেলের ড্রাম সাজিয়ে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতার প্রতীকী চিত্র তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি ছিল এই প্রদর্শনীর অন্যতম বার্তা।ট্রাম্পের পরাজয়ে ইরানিদের উচ্ছ্বাস১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল ও জিম্মি সংকটের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে প্রতিবছর এ সমাবেশ আয়োজন করা হয়। এবার যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ট্রাম্পের দলের পরাজয় বিক্ষোভকারীদের উচ্ছ্বাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।সমাবেশে অংশ নেওয়া ৪০ বছর বয়সী মাহমুদখানি বলেন, ‘আমেরিকা বহু বছর ধরে আমাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে। কিন্তু ইরানের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।’তবে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিয়েও কথা বলেন তিনি। তার ভাষায়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ইরানিরা খুশি নন। কিন্তু এতদিন নিষেধাজ্ঞার কারণে যে অর্থনৈতিক কষ্ট শুধু তাদেরই বহন করতে হয়েছে, এখন সেই চাপ বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মানুষও অনুভব করছেন।হরমুজ প্রণালি নিয়ে বাড়ছে উত্তেজনাবিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর জবাবে ওয়াশিংটনও ইরানের প্রধান বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।তেহরানের ৬২ বছর বয়সী কাপড় ব্যবসায়ী মজিদ হেইদারি মনে করেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।তিনি বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র যখন একজোট হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তখন নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তেহরানকেও শক্ত অবস্থান নিতে হয়। তার মতে, আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির জন্য হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নেওয়া পদক্ষেপ ইরানের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত হাতিয়ার।তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে উচ্ছ্বাস থাকলেও ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে দেশটির অনেক নাগরিকের।ইরানের সরকারি কর্মকর্তা মোহাম্মদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট কিংবা রিপাবলিকান—যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, ইরানের প্রতি দেশটির নীতিতে খুব বেশি পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন না। গত ৫০ বছর ধরেই ইরানের প্রতি ওয়াশিংটনের মনোভাব প্রায় একই রকম রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।যুদ্ধের বিরুদ্ধে মার্কিন জনমতকে স্বাগত তেহরানেরমার্কিন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানান ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, বিবেকের তাড়নায় হোক কিংবা জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয়ের কারণে, মার্কিন জনগণ স্পষ্টভাবে যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ইরানও তাদের এই বার্তাকে পূর্ণ সমর্থন জানায়।তবে নির্বাচনে ট্রাম্পের দলের পরাজয় সত্ত্বেও দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কা এখনো প্রবল।তেহরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বাঘেরিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো পরিস্থিতিতেই ইরানের শত্রু। হোয়াইট হাউসে কে ক্ষমতায় থাকল, তাতে ইরানের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হবে না।সব মিলিয়ে ট্রাম্পের নির্বাচনী পরাজয় ইরানে সাময়িক উচ্ছ্বাস তৈরি করলেও দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অবিশ্বাস ও সংশয় এখনো গভীর। তাদের অনেকের কাছেই ওয়াশিংটনে ক্ষমতার পালাবদলের চেয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বৈরিতার অবসানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
