Uncategorized

নাটকীয় লড়াইয়ে রোনালদোর পর্তুগালের জয়, অশ্রুসিক্ত বিদায় মদরিচের ক্রোয়েশিয়ার

একটি ম্যাচে যেন ফুটবলের সব রংই একসঙ্গে ধরা দিল। গোল, অফসাইড, ভিএআরের একের পর এক নাটকীয় সিদ্ধান্ত, যোগ করা সময়ের রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত এবং শেষ বাঁশি বাজতেই দুই দলের সম্পূর্ণ ভিন্ন আবেগ—সব মিলিয়ে টরন্টোর মঞ্চে ফুটবলপ্রেমীরা উপভোগ করলেন বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় এক নকআউট লড়াই।

কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছে ক্রোয়েশিয়াকে। এই জয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে পর্তুগিজরা। অন্যদিকে, বিশ্বকাপের মঞ্চে সম্ভবত শেষবারের মতো খেলতে নেমে হৃদয়ভাঙা বিদায় নিতে হয়েছে ৪০ বছর বয়সী কিংবদন্তি লুকা মদরিচকে।

প্রথমার্ধে গোলশূন্য, তবু উত্তেজনার কমতি ছিল না

প্রথমার্ধে বলের দখল ও আক্রমণে স্পষ্ট আধিপত্য ছিল পর্তুগালের। ব্রুনো ফার্নান্দেজ, রাফায়েল লিয়াও, জোয়াও কানসেলো ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বারবার ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করলেও শেষ পর্যন্ত গোলের দেখা মেলেনি।

নাটকীয় লড়াইয়ে রোনালদোর পর্তুগালের জয়, অশ্রুসিক্ত বিদায় মদরিচের ক্রোয়েশিয়ার…………

পর্তুগালের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দেন ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক ডমিনিক লিভাকোভিচ। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়াও খুব বেশি কার্যকর আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে ০-০ সমতায় বিরতিতে যায় দুই দল।

দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র

বিরতির পরই ম্যাচে আসে নাটকীয় মোড়। ৫৩তম মিনিটে জোসিপ স্তানিসিচের নিখুঁত ক্রস থেকে নিচু শটে গোল করে ক্রোয়েশিয়াকে এগিয়ে দেন অভিজ্ঞ উইঙ্গার ইভান পেরিসিচ।

তিন মিনিট পর আবারও পর্তুগালের জালে বল জড়িয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। তবে ভিএআরের সহায়তায় অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়।

এরপর শুরু হয় রোনালদোর জবাব। ৬১তম মিনিটে কানসেলোর পাস থেকে বল জালে পাঠালেও অত্যন্ত সূক্ষ্ম অফসাইডের কারণে ভিএআর সেই গোলটি বাতিল করে দেয়।

তবে হতাশা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৬৪তম মিনিটে ভিএআর রিভিউয়ের পর ভেইগার জার্সি টেনে ধরার অপরাধে পর্তুগাল পায় পেনাল্টি। ৬৮তম মিনিটে স্পট কিক থেকে নির্ভুল শটে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।

এই গোলের মাধ্যমে নিজের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে গোল করার কীর্তি গড়েন পর্তুগিজ মহাতারকা।

গোলের পর গোল, কিন্তু বারবার বাধা ভিএআর

সমতায় ফেরার পর ম্যাচের গতি আরও বেড়ে যায়। ৭৫তম মিনিটে মাতেও কোভাচিচের দূরপাল্লার দুর্দান্ত শট এবং ফিরতি বল অবিশ্বাস্য দক্ষতায় রুখে দিয়ে পর্তুগালকে রক্ষা করেন গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তা।

৮০তম মিনিটে আবারও বল জালে পাঠায় ক্রোয়েশিয়া। কিন্তু লাইন্সম্যানের অফসাইডের পতাকায় মুহূর্তেই ম্লান হয়ে যায় তাদের আনন্দ।

এর এক মিনিট পরই কোচ রবার্তো মার্তিনেজ মাঠ থেকে তুলে নেন রোনালদোকে। বদলি হওয়ার সময় তার মুখে কিছুটা অসন্তোষের ছাপ স্পষ্ট ছিল।

রামোসের গোলে এগিয়ে পর্তুগাল

ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকেই এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে রাফায়েল লিয়াওয়ের দারুণ ক্রস থেকে শক্তিশালী হেডে গোল করেন বদলি স্ট্রাইকার গনসালো রামোস। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় পর্তুগাল, আর জয়ের স্বপ্ন তখন হাতছানি দিচ্ছিল।

শেষ মুহূর্তের হৃদয়ভাঙা নাটক

তবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় নাটক তখনও বাকি।

প্রথমে ১০ মিনিট অতিরিক্ত সময় দেওয়া হলেও গোল উদযাপন ও খেলা বন্ধ থাকার কারণে ম্যাচ আরও দীর্ঘায়িত হয়।

যোগ করা সময়ের ১৩তম মিনিটে (১০৩ মিনিট) ইয়োস্কো গভার্দিওল বল জালে পাঠিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে সমতায় ফেরানোর উল্লাসে ভাসান। পুরো স্টেডিয়াম তখন উৎসবে মেতে ওঠে।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরই রেফারি ভিএআরের নির্দেশে মনিটরে গিয়ে পুরো আক্রমণটি পর্যালোচনা করেন। রিপ্লেতে দেখা যায়, আক্রমণের শুরুতে মারিও পাশালিচ অফসাইডে ছিলেন। ফলে গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত দেন রেফারি।

মুহূর্তেই উৎসব পরিণত হয় হতাশায়। ক্ষুব্ধ ক্রোয়েশিয়ান সমর্থকদের কেউ কেউ গ্যালারি থেকে বোতল নিক্ষেপ করলে কিছু সময়ের জন্য খেলা বন্ধ থাকে।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর শেষ বাঁশি বাজান রেফারি।

একদিকে উল্লাস, অন্যদিকে অশ্রু

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দে মেতে ওঠেন পর্তুগিজ খেলোয়াড়রা। আর মাঠের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েন লুকা মদরিচ ও তার সতীর্থরা।

রোনালদোর জন্যও ম্যাচটি ছিল বিশেষ স্মরণীয়। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রথম গোল করার পাশাপাশি তিনি দলকে নিয়ে গেলেন শেষ ষোলোতে।

এখন পর্তুগালের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী সোমবার (বাংলাদেশ সময় রাত ১টা) কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে শক্তিশালী স্পেনের মুখোমুখি হবে রোনালদোর দল। ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা, সেই ম্যাচও উপহার দেবে আরেকটি হাইভোল্টেজ লড়াই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *