Uncategorized

দুর্দিনের কাণ্ডারি মির্জা ফখরুল যাচ্ছেন বঙ্গভবনে

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার আগে তিনি বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে দলের মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল। এ সময় দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

দুর্দিনের কাণ্ডারি মির্জা ফখরুল যাচ্ছেন বঙ্গভবনে….

পরে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনে গিয়ে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেয়। স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ড. আব্দুল মঈন খানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি দুপুর ২টার পর নির্বাচন কমিশনে যায়। দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচনী কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। এতে প্রস্তাবক হিসেবে রয়েছেন ড. আব্দুল মঈন খান এবং সমর্থক গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

বদল আসছে দল ও সরকারে

রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ায় বিএনপির মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য—এই চারটি দায়িত্বেই পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। দল ও সরকারে এখন স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ।

পরবর্তী মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী কে হচ্ছেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। জানতে চাইলে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘এটার জন্য অপেক্ষা করুন, পরে জানানো হবে।’

শিক্ষক থেকে রাষ্ট্রপতি

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক ও কর্মজীবনের পথচলা বেশ বৈচিত্র্যময়। ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি নেতৃত্বে আসেন। পরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন।

১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর শক্ত অবস্থান তৈরি হয়। এর পর ধাপে ধাপে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসেন তিনি।

দুর্দিনের কাণ্ডারি মির্জা ফখরুল যাচ্ছেন বঙ্গভবনে…

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায় জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছাত্রজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছিলেন। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

দুর্দিনের কাণ্ডারি মির্জা ফখরুল যাচ্ছেন বঙ্গভবনে..

রাজনীতির শুরুতে আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাপে যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল। পরে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর উত্থান আরও দৃশ্যমান হয়। পরবর্তী সময়ে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি দলটির শীর্ষ সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন।

দুর্দিনে দলের হাল ধরেছেন

বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময় মির্জা ফখরুলকে দলের অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে দেখা হয়েছে। বিশেষ করে এক-এগারোর পরবর্তী সময় এবং আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে দেশের ভেতরে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

২০১৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দলের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সময়ে তারেক রহমান লন্ডন থেকে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। দেশের ভেতরে দলীয় কর্মসূচি, আন্দোলন ও রাজনৈতিক যোগাযোগে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মির্জা ফখরুল।

আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় তাঁকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করতে হয়েছে। দলের নেতাদের মতে, কঠিন সময়ে নানা চাপের মধ্যেও তিনি দলকে ধরে রেখেছেন এবং বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন।

বিএনপি নেতাদের একটি অংশ মনে করেন, দীর্ঘদিনের এই অবদান এবং দলের সংকটকালে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যও ছিলেন

২০০১ সালে বিএনপি সরকারের সময় মির্জা ফখরুল কৃষি এবং বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে তিনি স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।

দুর্দিনের কাণ্ডারি মির্জা ফখরুল যাচ্ছেন বঙ্গভবনে..

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হন তিনি। বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে বিএনপি নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করায় তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। সংসদীয় ইতিহাসে ঘটনাটি ব্যতিক্রমী হিসেবে বিবেচিত হয়।

‘সচিবালয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়নি’

রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত করতে সচিবালয়ে বৈঠক হয়েছে—এমন আলোচনার বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, সচিবালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি। দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আগেই প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি শুধু স্থায়ী কমিটির সদস্যদের ডেকে সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন এবং মির্জা ফখরুলের হাতে মনোনয়নপত্র তুলে দিয়েছেন।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দল থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন। তাই দলের আলোচনা বাংলাদেশের যেকোনো জায়গায় হতে পারে।

একই কথা বলেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীও। তাঁর বক্তব্য, এটি স্থায়ী কমিটির বৈঠক ছিল না; স্থায়ী কমিটির সদস্যরা আগেই দলীয় চেয়ারম্যানকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়া শুধু বিএনপির নেতৃত্বে পরিবর্তন আনছে না, দল ও সরকার—দুই জায়গাতেই নতুন সমীকরণের দরজা খুলে দিয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তাঁর অভিষেকের অপেক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *