হাওরের বুকে এখন শুধুই পানি আর কৃষকের হাহাকার। বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাজারো কৃষক। সরকারি হিসাব এক কথা বলছে, আর মাঠের বাস্তবতা যেন তার চেয়েও অনেক কঠিন—এই বৈপরীত্য এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে অধিকাংশ হাওর পানিতে ডুবে গেছে। কোথাও কাঁচা ধান কেটে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে, কোথাও আবার কাটা ধান পানিতে ভিজে পচে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় রোদ না থাকায় শুকানোর সুযোগ না পেয়ে ধানেই চারা গজিয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু ফলনই নয়, চালের মানও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কৃষকরা বলছেন, সরকারি হিসাবে যে পরিমাণ ক্ষতির কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি জমির ধান নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে যেসব জমি কয়েকদিন ধরে পানির নিচে রয়েছে, সেগুলো থেকে আর ফসল উদ্ধারের আশা প্রায় নেই। অনেকের আশঙ্কা—এ বছর শুধু ধান নয়, গবাদিপশুর খাদ্য খড় জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্যে বলা হয়েছে, প্রায় ৪৬ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর দাবি, ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৭৫ হাজার হেক্টর বা তারও বেশি হতে পারে। মাঠ পর্যায়ের তথ্য ও কেন্দ্রীয় হিসাবের মধ্যেও মিল পাওয়া যাচ্ছে না, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জে, এরপর নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জে। কোথাও ক্ষতির হার ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। যদিও কিছু এলাকায় এখনও আংশিকভাবে ধান ঘরে তোলার আশা রয়েছে, তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
এদিকে কৃষকদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে শ্রমিক সংকট। ধান কাটার মজুরি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেলেও পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। আগে যেখানে ৮০০-১০০০ টাকায় শ্রমিক মিলত, এখন সেখানে ১৫০০-২০০০ টাকা দিয়েও পাওয়া কঠিন। ফলে অনেক জমির ধান সময়মতো কাটাই সম্ভব হয়নি।
কিশোরগঞ্জের ইটনা, অষ্টগ্রাম ও করিমগঞ্জ এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। অনেক কৃষক ধান কাটার আগেই তা পানিতে হারিয়েছেন। যেটুকু ধান কাটা গেছে, সেটিও ঠিকমতো শুকানো যাচ্ছে না। ফলে বাজারে দাম কমে গেছে প্রায় অর্ধেকে—যেখানে আগে মণপ্রতি ৭০০-৮০০ টাকা পাওয়া যেত, এখন তা নেমে এসেছে ৪০০-৫০০ টাকায়।
এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানবিকও। অষ্টগ্রামে নিজের জমির ধান তলিয়ে যেতে দেখে এক কৃষকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে, যা পরিস্থিতির গভীরতা আরও স্পষ্ট করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব না হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম ব্যাহত হবে। তাই দ্রুত নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
সরকার বলছে, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সহায়তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে এখনো মাঠপর্যায়ে বড় পরিসরে সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়নি।
হাওরের চারদিকে এখন অনিশ্চয়তা—ঋণের বোঝা, ক্ষতির হিসাব আর ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা নিয়ে দিন কাটছে কৃষকদের। প্রকৃতির এই নির্মম আঘাত থেকে তারা কবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
