কেন ইরাকে নেওয়া হচ্ছে খামেনির মরদেহ? আঞ্চলিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেখছেন বিশ্লেষকেরা
আগামী ৮ জুলাই ইরাকের পবিত্র শহর কারবালা ও নাজাফে নেওয়া হবে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মরদেহ। সেখানে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এবং পপুলার মোবিলাইজেশন ইউনিটস (পিএমইউ)-এর সহযোগিতায় বৃহৎ পরিসরে শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। পরে মরদেহ আবার ইরানের মাশহাদে নেওয়া হবে, যেখানে তাকে দাফন করা হবে।
একজন ইরানি নেতার শেষ বিদায়ের গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন কেন ইরাকে হচ্ছে—এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় নেতাদের শেষকৃত্য শুধু শোক প্রকাশের অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি রাজনৈতিক বৈধতা, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং মিত্রদের ঐক্য প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাধ্যম।
কেন ইরাকে নেওয়া হচ্ছে খামেনির মরদেহ? আঞ্চলিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেখছেন বিশ্লেষকেরা………..
তাদের মতে, ইরাকে খামেনির স্মরণানুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে তেহরান আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক ও সমর্থনের বার্তা আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে চাইছে। বিশেষ করে ইরাকভিত্তিক শিয়া রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন করে দৃশ্যমান হবে।
ইরাককে বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কারণ। কারবালা ও নাজাফ শিয়া ইসলামের অন্যতম পবিত্র কেন্দ্র এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিয়া ধর্মীয় শিক্ষা, নেতৃত্ব ও তীর্থযাত্রার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসে কাজার রাজবংশের কয়েকজন ইরানি শাসকও কারবালায় সমাহিত হয়েছেন। ফলে এই দুই শহরে শোকানুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে খামেনির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তরাধিকারকে শিয়া ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিষয়টি দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সিরিয়ায় তাদের অবস্থান দুর্বল হয়েছে, লেবাননে চাপ বেড়েছে এবং ইরাকে পিএমইউকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগও জোরদার হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরাকে বৃহৎ পরিসরের শোকানুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে তেহরান দেখাতে চাইছে যে, তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা এখনো ঐক্যবদ্ধ এবং এই সম্পর্ক কেবল সামরিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাজনৈতিক, সামাজিক ও আদর্শিক ভিত্তিতেও শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। খামেনির মৃত্যুর প্রায় চার মাস পর এই আনুষ্ঠানিক শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এরই মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলো আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়িয়েছে এবং ইরাকও নিজেকে আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দূরে রাখার নীতি অনুসরণ করছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়োজন কেবল একজন প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অনুষ্ঠান নয়। বরং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, মিত্রদের প্রতি বার্তা এবং কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেই এই শোকানুষ্ঠানকে দেখা হচ্ছে।
